“সাগরের তীর থেকে মিষ্টি কিছু হাওয়া এনে,
তোমার কপালে ছোঁয়াবো গো ভাবি মনে মনে...”
স্মৃতির পর্দায় বয়ে যায় সুরের ঢেউ, হৃদয়ে বাজে এক শোকগাথা।
সুরের জগতে আমাদের সোনালী অতীতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন প্রথিতযশা কণ্ঠশিল্পী জীনাত রেহানা। ষাটের দশক থেকে বাংলা গানের জগতে তাঁর ছিল অনন্য অবদান। তাঁর কণ্ঠে প্রাণ পেয়েছে
"একটি ফুল আর একটি পাখি বলতো কি নামে তোমায় ডাকি"
"আমি কাকন দিয়ে ডেকেছিলেম মুখে লজ্জা ছিল বলে"
"আমি যার কথা ভাবছি মনে আনমনে"
"আমায় যদি ডাকো কাছে",
"কণ্ঠবীণা",
"মনে রেখো, স্মৃতি থেকে"
– এমন বহু হৃদয়স্পর্শী গান।
তাঁর গাওয়া বিখ্যাত গান “সাগরের তীর থেকে” ১৯৬৮ সালে রেকর্ড হওয়ার পর তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই গানসহ অনেক গানের গীতিকার ছিলেন তাঁর মা — শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক জেব-উন-নেসা জামাল। মা-ই ছিলেন তাঁর অনুপ্রেরণা ও গানের পথপ্রদর্শক। খালা আঞ্জুমান আরা বেগম-ও ছিলেন প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী — বলা যায়, সংগীত ছিল তাঁর রক্তে বইতে থাকা উত্তরাধিকার।
জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৮ সালের ৩ জুলাই, চট্টগ্রামে। শিক্ষা জীবনে ছিলেন কৃতী – পড়াশোনা করেছেন ড. খাস্তগীর গভ. গার্লস হাই স্কুল এবং পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনপ্রশাসন বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন।
১৯৬৪ সালে বাংলাদেশ বেতারে এবং ১৯৬৫ সালে টেলিভিশনে সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে পেশাগত যাত্রা শুরু করেন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ সময় কাজ করার কারণে একসময় গানে অনিয়মিত হলেও, পরবর্তী জীবনে তিনি আবার গানেই ফিরেছিলেন মনেপ্রাণে।
আধুনিক ও আধ্যাত্মিক গানের পাশাপাশি শিশুতোষ গানেও ছিল তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান। মা'র লেখা বই "জাদুর পেন্সিল" থেকে শিশুদের জন্য গান তৈরি করেছিলেন তিনি।
তাঁর জীবনসঙ্গী ছিলেন বাংলাদেশের টেলিভিশন অঙ্গনের কিংবদন্তি ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব মোস্তফা কামাল সৈয়দ। ১৯৬৮ সালে তাঁদের বিবাহবন্ধন হয়। তাঁদের রয়েছে এক পুত্র ও এক কন্যা।
জীনাত রেহানা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০২৫ সালের ২ জুলাই, জন্মদিনের ঠিক আগের দিন, ঢাকার একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণে বাংলা সংগীতজগতে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হলো।
আজ আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি সেই অনন্য শিল্পীকে, যিনি গানকে শুধু গাইতেন না, ভালোবাসতেন হৃদয়ের গভীর থেকে।
তাঁর গান, তাঁর কণ্ঠ, তাঁর অবদান চিরকাল বেঁচে থাকবে আমাদের মননে, আমাদের সুরস্মৃতিতে।
তাঁর প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।