১৯৫৮ সালের ৮ জুলাই ভারতের নয়াদিল্লিতে পাঞ্জাবি শিখ পরিবারে হরনীত কৌর সিং নামে তাঁর জন্ম। পিতা দর্শন সিং এবং মাতা রাজী কৌর সিং। শৈশবেই পিতাকে হারানোর পর পরিবারের দায়িত্বের অংশ হিসেবে খুব অল্প বয়সেই চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করেন। শিশু শিল্পী হিসেবে তিনি ‘বেবি সোনিয়া’ নামে পরিচিতি লাভ করেন।
মাত্র আট বছর বয়সে ১৯৬৬ সালে ‘সূরজ’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তাঁর অভিনয়জীবনের সূচনা হয়।
কিংবদন্তি অভিনেত্রী বৈজয়ন্তীমালা-র পরামর্শেই পরিচালক টি. প্রকাশ রাও তাঁকে ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ দেন। এরপর ‘দুস লাখ’ (১৯৬৬), ‘দো কলিয়াঁ’ (১৯৬৮), ‘ওয়ারিস’ (১৯৬৯), ‘পবিত্র পাপী’ (১৯৭০) এবং ‘ঘর ঘর কি কাহানি’-সহ একাধিক ছবিতে শিশু শিল্পী হিসেবে অভিনয় করে তিনি দর্শকদের প্রশংসা অর্জন করেন।
প্রধান নায়িকা হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৯৭৩ সালে ‘রিকশাওয়ালা’ চলচ্চিত্রে।
একই বছর ‘ইয়াদোঁ কি বারাত’-এ তাঁর সংক্ষিপ্ত উপস্থিতি এবং জনপ্রিয় গান ‘লেকর হাম দিওয়ানা দিল’-এ প্রাণবন্ত নৃত্য তাঁকে রাতারাতি আলোচনায় নিয়ে আসে। এরপর তিনি সত্তর ও আশির দশকের অন্যতম জনপ্রিয় নায়িকায় পরিণত হন।
নীতু সিং তাঁর স্বাভাবিক অভিনয়, প্রাণবন্ত ব্যক্তিত্ব এবং হাস্যোজ্জ্বল পর্দা উপস্থিতির জন্য বিশেষভাবে সমাদৃত ছিলেন। তিনি সেই সময়ের প্রায় সব শীর্ষ অভিনেতার সঙ্গে সফলভাবে অভিনয় করেছেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন রণধীর কাপুর, শশী কাপুর, রাজেশ খান্না, জিতেন্দ্র, বিনোদ খান্না, শত্রুঘ্ন সিনহা এবং অমিতাভ বচ্চন।
তবে তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় জুটি ছিল ঋষি কাপুর-এর সঙ্গে। বাস্তব ও রূপালি—দুই জীবনেই এই জুটি ভারতীয় দর্শকদের হৃদয়ে বিশেষ স্থান করে নিয়েছে। তাঁরা একসঙ্গে অভিনয় করেন ‘খেল খেল মে’, ‘রফু চক্কর’, ‘কভি কভি’, ‘অমর আকবর অ্যান্টনি’, ‘দুনিয়া মেরি জেব মে’, ‘ঝুঠা কাহিঁ কা’, ‘ধন দৌলত’-সহ এক ডজনেরও বেশি চলচ্চিত্রে।
এছাড়া তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘দিওয়ার’, ‘ধরম বীর’, ‘জানি দুশমন’, ‘দ্য বার্নিং ট্রেন’, ‘কালা পাথর’, ‘চক্রব্যূহ’, ‘প্রিয়তমা’, ‘চোরনি’ এবং ‘ধোঁগী’। প্রধান নায়িকা হিসেবে অভিনীত প্রায় ৫০টি চলচ্চিত্রের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি বক্স অফিসে সফল হয়েছিল—যা তাঁর জনপ্রিয়তারই প্রমাণ।
১৯৮০ সালের ২২ জানুয়ারি, মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি অভিনেতা ঋষি কাপুর-কে বিয়ে করেন। তখন তিনি ক্যারিয়ারের শীর্ষে অবস্থান করছিলেন। বিয়ের পর স্বেচ্ছায় অভিনয় থেকে বিরতি নেন এবং সংসার ও সন্তানদের লালন-পালনে নিজেকে নিবেদিত করেন। পরবর্তীকালে তিনি স্পষ্টভাবে জানান, অভিনয় ছেড়ে দেওয়া ছিল তাঁর সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।
তাঁদের দুই সন্তান—ফ্যাশন ডিজাইনার ঋদ্ধিমা কাপুর সাহনি এবং বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা রণবীর কাপুর।
দীর্ঘ ২৬ বছর পর তিনি অভিনয়ে ফিরে আসেন। ‘লাভ আজ কাল’ (২০০৯), ‘দো দুনি চার’ (২০১০), ‘যব তক হ্যায় জান’ (২০১২) এবং ‘বেশরম’ (২০১৩)-এ তাঁর অভিনয় দর্শকদের নতুন করে মুগ্ধ করে। ২০১১ সালের জি সিনে অ্যাওয়ার্ডস-এ নীতু সিং ও ঋষি কাপুর ‘বেস্ট লাইফটাইম জোড়ি’ সম্মানে ভূষিত হন।
২০১৮ সালে ঋষি কাপুরের লিউকেমিয়ার চিকিৎসার সময় তিনি স্বামীর পাশে থেকে নিউইয়র্কে দীর্ঘদিন কাটিয়েছেন। ২০২০ সালের ৩০ এপ্রিল ঋষি কাপুরের প্রয়াণের পরও তিনি অসীম ধৈর্য, শক্তি ও মর্যাদার সঙ্গে পরিবারকে আগলে রেখেছেন এবং অভিনয়জগতে নিজের দ্বিতীয় ইনিংস সফলভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন।
অভিনয়ের পাশাপাশি তাঁর সৌন্দর্য, প্রাণবন্ত ব্যক্তিত্ব, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং দৃঢ় মানসিকতা তাঁকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের এক অনন্য আইকনে পরিণত করেছে। প্রজন্মের পর প্রজন্মের দর্শকদের কাছে তিনি আজও সমানভাবে প্রিয় ও শ্রদ্ধেয়।
শুভ জন্মদিন, নীতু সিং (নীতু কাপুর)।
আপনার সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু, সুখ, শান্তি এবং শিল্পী জীবনের অব্যাহত সাফল্য কামনা করি। ভারতীয় চলচ্চিত্রে আপনার অবদান চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
জন্মদিনের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অফুরন্ত ভালোবাসা।