বাংলাদেশের চলচ্চিত্র, টেলিভিশন ও সংগীতাঙ্গনের এক বহুমাত্রিক প্রতিভার নাম নাজমুল হুদা বাচ্চু। তিনি ছিলেন একাধারে অভিনেতা, সঙ্গীতশিল্পী, সঙ্গীত পরিচালক ও নাট্যকর্মী। সহজ-স্বাভাবিক অভিনয়, প্রাণবন্ত উপস্থাপনা এবং সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগ তাঁকে দেশের সংস্কৃতিজগতের একজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল।
১৯৩৮ সালের ১১ জুলাই তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের মাগুরা জেলায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন শামসুল হুদা এবং মাতা আনোয়ারা হুদা। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল। ১৯৫৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই সংগীতচর্চায় সক্রিয় হয়ে ওঠেন এবং ছাত্রজীবনেই বাংলাদেশ বেতারে গান পরিবেশন শুরু করেন।
১৯৬১ সালে মুস্তাফিজ পরিচালিত 'হারানো দিন' চলচ্চিত্রে রবিন ঘোষের সুরে "অভিমান করো না" গানটির মাধ্যমে তাঁর প্লেব্যাক গায়ক হিসেবে যাত্রা শুরু হয়। পরে তিনি 'বেহুলা', 'জোয়ার এলো', 'চান্দা', 'ফির মিলেঙ্গে হাম দোনো', 'কার পাপে'-সহ বহু চলচ্চিত্রে কণ্ঠ দেন। এছাড়া 'লালন ফকির'-সহ একাধিক নাটকে সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্বও পালন করেন।
অভিনয়ে আসার ইচ্ছা তাঁর প্রথমে ছিল না। তবে সংগীত পরিচালক আলতাফ মাহমুদের উৎসাহে 'আঁকাবাঁকা' চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তাঁর পর্দাজীবনের সূচনা হয়। নিজের গাওয়া গানে নিজেই লিপসিং করতে গিয়েই অভিনয়ের জগতে তাঁর পদার্পণ।
ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এস. এম. হল ও ডাকসু-র নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে বাংলাদেশ টেলিভিশনে মনিরুল আলমের প্রযোজনায় একটি নাটকের মাধ্যমে তাঁর টেলিভিশন অভিষেক ঘটে। ধারাবাহিক 'চাচা-ভাতিজা'-তে 'চাচা' চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকদের কাছে ব্যাপক প্রশংসিত হয়। পাশাপাশি কিংবদন্তি হানিফ সংকেত-এর জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান 'ইত্যাদি'-র বিভিন্ন নাট্যাংশে তাঁর নিয়মিত অভিনয় তাঁকে ঘরে ঘরে পরিচিত ও জনপ্রিয় করে তোলে।
তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে—
সারেং বউ, স্বামী, সখি তুমি কার, সূর্য দীঘল বাড়ি, অচেনা অতিথি, জীবন মৃত্যু, ভালো মানুষ, বাজিমাত, মাটির মায়া, আবার তোরা মানুষ হ, রানওয়ে, অজ্ঞাতনামা প্রভৃতি।
তিনি ছিলেন বাংলাদেশ বেতারের তালিকাভুক্ত শিল্পী। নাট্যচর্চা ও সংগীত পরিচালনার পাশাপাশি নতুন শিল্পীদের গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। প্রয়াত নন্দিত অভিনেতা বুলবুল আহমেদ ছিলেন তাঁর আপন ফুফাতো ভাই, আর বুলবুল আহমেদের প্রথম নাটক 'উল্কা'-র নির্দেশনার দায়িত্বও পালন করেছিলেন নাজমুল হুদা বাচ্চু।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ১৯৬৪ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর লিনা হুদাকে বিয়ে করেন।
তাঁদের তিন কন্যা—সানিয়া নাজ, সায়কা নাজ ও সাদিয়া নাজ।
দীর্ঘ অভিনয় ও সংগীতজীবনে তিনি অসংখ্য চলচ্চিত্র, টেলিভিশন নাটক, বেতার অনুষ্ঠান এবং বিজ্ঞাপনে কাজ করেছেন। তাঁর সাবলীল অভিনয়, আন্তরিক ব্যক্তিত্ব এবং শিল্পের প্রতি নিবেদন আজও দর্শক-শ্রোতাদের হৃদয়ে অম্লান।
২০১৭ সালের ২৮ জুন, ৭৮ বছর বয়সে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
শিল্পী নাজমুল হুদা বাচ্চু আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর সৃষ্টিকর্ম, কণ্ঠ, অভিনয় এবং সংস্কৃতির প্রতি অসামান্য অবদান বাংলা নাটক, চলচ্চিত্র ও সংগীতের ইতিহাসে চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি।
শ্রদ্ধায় স্মরণ করি নাজমুল হুদা বাচ্চুকে—বাংলাদেশের সংস্কৃতির এক নিবেদিতপ্রাণ শিল্পীকে।