ভারতীয় হিন্দি চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগের অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক, প্রযোজক ও পরিচালক রাজেন্দ্র কুমার আজও কোটি দর্শকের হৃদয়ে অম্লান। ষাটের দশকে একের পর এক সুপারহিট চলচ্চিত্র উপহার দিয়ে তিনি অর্জন করেছিলেন কিংবদন্তিতুল্য জনপ্রিয়তা। সেই সময় তাঁর একাধিক ছবি একসঙ্গে ২৫ সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় প্রেক্ষাগৃহে চলেছিল। এ কারণেই তিনি চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে পরিচিতি পান "জুবিলি কুমার" নামে।
বর্তমান পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে ১৯২৯ সালের ২০ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন রাজেন্দ্র কুমার। তাঁর পিতা করাচিতে ব্যবসা করতেন এবং দাদা ছিলেন ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন কর্মচারী। দেশভাগের পর পরিবারসহ তিনি মুম্বাইয়ে চলে আসেন। শুরুতে তাঁর স্বপ্ন ছিল চলচ্চিত্র পরিচালক হওয়ার, কিন্তু ভাগ্যের পরিক্রমায় তিনি হয়ে ওঠেন ভারতীয় সিনেমার অন্যতম সফল নায়ক।
১৯৪৯ সালে 'পতঙ্গা' চলচ্চিত্রে একটি ছোট চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তাঁর চলচ্চিত্রজীবনের সূচনা হয়। এরপর ১৯৫০ সালে কেদার শর্মা পরিচালিত 'জোগন' চলচ্চিত্রে দিলীপ কুমার ও নার্গিসের সঙ্গে অভিনয় করেন। ১৯৫৫ সালে 'বচন' চলচ্চিত্র তাঁর ক্যারিয়ারের প্রথম বড় সাফল্য এনে দেয়। এরপর মেহবুব খান পরিচালিত কালজয়ী 'মাদার ইন্ডিয়া' (১৯৫৭)-এ নার্গিসের ছেলের চরিত্রে
অভিনয় করে তিনি ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেন।
১৯৫৯ সালের 'গুঞ্জ উঠি শেহনাই' তাঁকে রোমান্টিক নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এরপর টানা এক দশক তিনি উপহার দেন অসংখ্য ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
- ধূল কা ফুল (১৯৫৯)
- কানুন (১৯৬০)
- ঘরানা (১৯৬১)
- সসুরাল (১৯৬১)
- দিল এক মন্দির (১৯৬৩)
- মেরে মেহবুব (১৯৬৩)
- সঙ্গম (১৯৬৪)
- আয়ে মিলন কি বেলা (১৯৬৪)
- আরজু (১৯৬৫)
- সুরজ (১৯৬৬)
- গোরা অউর কালা (১৯৭২)
তাঁর অভিনয় দক্ষতার জন্য তিনি একাধিকবার ফিল্মফেয়ার পুরস্কারের মনোনয়ন লাভ করেন। ১৯৬০-এর দশকে তাঁর জনপ্রিয়তা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, একসঙ্গে মুক্তিপ্রাপ্ত তাঁর ছয়-সাতটি চলচ্চিত্রই রজতজয়ন্তী উদযাপন করেছিল—যা ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসে এক বিরল কৃতিত্ব।
সত্তরের দশকে নতুন প্রজন্মের তারকা রাজেশ খান্নার আবির্ভাবের পর তিনি ধীরে ধীরে চরিত্রাভিনয়ে মনোনিবেশ করেন। 'সাজন বিনা সুহাগান' (১৯৭৮)-এ তাঁর অভিনয়ও দর্শকপ্রিয়তা লাভ করে। তিনি কয়েকটি পাঞ্জাবি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেন।
প্রযোজক হিসেবেও তিনি সফল ছিলেন। ১৯৮১ সালে নিজের ছেলে কুমার গৌরবকে 'লাভ স্টোরি' চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বলিউডে অভিষেক করান। ছবিটি সেই বছরের অন্যতম বড় ব্লকবাস্টার হয়। পরে তিনি ছেলেকে নিয়ে আরও কয়েকটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। ১৯৮৬ সালের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র 'নাম'-এ তিনি সঞ্জয় দত্তের সঙ্গে অভিনয় করেন। তাঁর শেষ প্রযোজিত চলচ্চিত্র ছিল 'ফুল' (১৯৯৩)। অভিনয়ের শেষ অধ্যায়ে তিনি 'আন্দাজ' ও 'বংশ' টেলিভিশন ধারাবাহিকেও কাজ করেন।
১৯৯৯ সালের ১২ জুলাই, ৭১ বছর বয়সে ঘুমের মধ্যেই হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় চলচ্চিত্র অঙ্গন হারায় এক উজ্জ্বল নক্ষত্রকে। কিন্তু তাঁর অসংখ্য কালজয়ী চলচ্চিত্র ও অনবদ্য অভিনয় আজও তাঁকে অমর করে রেখেছে।
২৭তম মৃত্যুবার্ষিকীতে কিংবদন্তি অভিনেতা রাজেন্দ্র কুমারের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র প্রণাম।
তাঁর শিল্পকীর্তি আগামী প্রজন্মের চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে চিরকাল অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।