বাংলার পেশাদার রঙ্গমঞ্চের ইতিহাসে যাঁদের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়, তাঁদের অন্যতম কেতকী দত্ত। অভিনয়, গান ও নৃত্য—এই তিন শিল্পমাধ্যমে সমান দক্ষতার অধিকারী তিনি ছিলেন বাংলা থিয়েটারের একজন প্রকৃত 'কমপ্লিট অভিনেত্রী'। মঞ্চ, চলচ্চিত্র, যাত্রা এবং ছোটপর্দা—সব ক্ষেত্রেই তিনি তাঁর অসামান্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন।
১৯৩৪ সালের ১৩ জুলাই কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন কেতকী দত্ত। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত মঞ্চ ও চলচ্চিত্র অভিনেত্রী প্রভা দেবী এবং নাট্যাভিনেতা তারাকুমার ভাদুড়ী-র সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। শিল্পচর্চার পরিবেশেই তাঁর বেড়ে ওঠা। তাঁর বড় ভাই ছিলেন বাংলা থিয়েটারের কিংবদন্তি অভিনেতা চপল ভাদুড়ী, যিনি নারী চরিত্রে অভিনয়ের জন্য বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।
মাত্র আট বছর বয়সে শিশুশিল্পী হিসেবে তাঁর অভিনয়জীবনের সূচনা। অভিনয়ের প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন নাট্যাচার্য শিশির কুমার ভাদুড়ী-র কাছে। নৃত্য শেখেন অভিনেত্রী ছোটো রাজলক্ষ্মী-র কাছে এবং সঙ্গীতের প্রথম পাঠ নেন তাঁর মা প্রভা দেবীর কাছেই। এই বহুমাত্রিক শিক্ষাই তাঁকে বাংলা থিয়েটারের অন্যতম শক্তিশালী শিল্পীতে পরিণত করে।
একবার নির্ধারিত নায়িকা সময়মতো মঞ্চে উপস্থিত না হওয়ায় অল্প বয়সেই কেতকী দত্তকে নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করতে হয়। নিজের কাকা মুরারি ভাদুড়ী-র বিপরীতে সেই অভিনয় দর্শকদের বিস্মিত করেছিল এবং তাঁর অসাধারণ সম্ভাবনার পরিচয় দিয়েছিল।
তিনি শ্রীরঙ্গম, স্টার থিয়েটার, রঙমহল-সহ কলকাতার বহু বিখ্যাত মঞ্চে অভিনয় করেছেন। ১৯৬৬ সালে রঙমহল ছেড়ে কাশী বিশ্বনাথ মঞ্চে যোগ দেন এবং পরবর্তীকালে দয়াল অপেরা-সহ বিভিন্ন যাত্রাদলেও অভিনয় করেন।
১৯৭২-৭৩ সালে চতুর্মুখ নাট্যদল প্রযোজিত আলোড়ন সৃষ্টিকারী নাটক 'বারবধূ'-তে তাঁর অভিনয় ছিল যুগান্তকারী। বিতর্কের কারণে নাটকটি বন্ধ হয়ে গেলেও তিনি থেমে থাকেননি। পরবর্তীকালে 'অ্যান্টনি কবিয়াল'-এ সৌদামিনী, 'নটী বিনোদিনী'-তে বিনোদিনী এবং ঊষা গাঙ্গুলির 'মুক্তি' নাটকে এক অসহায় বিধবার চরিত্রে তাঁর অভিনয় বাংলা নাট্যজগতে আজও স্মরণীয়।
ঋত্বিক ঘটকের 'নাগরিক' এবং 'কোমল গান্ধার'-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্রেও তিনি অভিনয় করেছেন। এছাড়া কঙ্কাল, পদিপিসির বর্মিবাক্স এবং সতীসহ একাধিক চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়েছে।
কেতকী দত্ত শুধু অভিনেত্রীই নন, ছিলেন একজন অসাধারণ গায়িকাও। নাটকের গান পরিবেশনায় তাঁর ছিল অসামান্য দক্ষতা। স্মৃতি থেকে একটানা ১৩০টিরও বেশি গান গেয়ে শোনানোর বিরল ক্ষমতা ছিল তাঁর। ১৯৯৭ সালে তিনি 'মঞ্চপ্রভা' নামে নিজস্ব নাট্যদল প্রতিষ্ঠা করেন এবং 'নিজ ভূমে' নাটকে একক অভিনয় করে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
তাঁর শিল্পসাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৯৪ সালে পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমি পুরস্কার এবং ১৯৯৯ সালে ভারতের সংগীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন।
দীর্ঘ সংগ্রাম, অক্লান্ত পরিশ্রম এবং অভিনয়ের প্রতি অদম্য ভালোবাসা নিয়ে তিনি আমৃত্যু শিল্পচর্চা করে গেছেন। ২০০৩ সালের ৭ জুলাই কলকাতায় তাঁর জীবনাবসান হলেও বাংলা রঙ্গমঞ্চে তাঁর অবদান আজও অমলিন।
বাংলা নাট্যজগতের এই অনন্য শিল্পীর ৯২তম জন্মবার্ষিকীতে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র প্রণাম। তাঁর শিল্পসাধনা আগামী প্রজন্মের কাছে চিরকাল প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।