গজল শুনেছেন কিন্তু মেহেদী হাসানের নাম শুনেননি এমন কাউকেই সম্ভবত খুঁজে পাওয়া যাবে না। মেহেদী হাসানের পূর্বে মুন্নি বেগম, বেগম আক্তার, কে. এল সায়গল, তালাত মাহমুদ গজল গেয়ে জনপ্রিয়তায় শীর্ষস্থান দখল করেছিলেন। উর্দু গজল ছাড়াও বাংলা গানেও রয়েছে তাঁর স্মরণযোগ্য অবদান। তাঁর গাওয়া বাংলা গান, 'হারানো দিনের কথা মনে পড়ে যায়'; 'ঢাকো যত না নয়ন দুহাতে'; 'তুমি যে আমার' প্রভৃতি গান বাংলাদেশের সংগীত প্রেমিরা চিরদিন মনে রাখবে। পাকিস্তান সরকারের তরফে তমঘা-ই-ইমতিয়াজ, প্রাইড অব পারফরম্যান্স এবং হিলাল-ই-ইমতিয়াজ এবং নেপাল সরকারের পক্ষ থেকে গোর্খা দক্ষিণা বাহু উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন।
আজ কিংবদন্তি গজল সম্রাট মেহেদী হাসান খান-এর জন্মদিন। গজলপ্রেমী কেউই নেই, যিনি তার গলায় বাঁধা যাদুতে না মুগ্ধ হয়েছেন। তার কণ্ঠে গজল শুধু সংগীত ছিল না—ছিল আবেগ, দর্শন, এবং এক জীবনের গল্প।
১৯২৭ সালের ১৮ জুলাই, অবিভক্ত ভারতের রাজস্থানের ঝুন ঝুন জেলার লুনা গ্রামে,এক সংগীত পরিবারে। ১৯৪৭-এ দেশ ভাগের পরে ২০ বছর বয়সী মেহেদী হাসান এবং তাঁর পরিবার ভারত ছেড়ে পাকিস্তানের শাহিওয়াল এলাকায় চলে আসেন। নতুন দেশে এসে জীবনের তাগিদে তরুণ মেহেদী হাসানকে জীবনসংগ্রামে নামতে হয়। কিন্তু সংগীতের দুর্নিবার আকর্ষণ তাঁকে সংগীতচর্চায় উদ্বুদ্ধ করতে থাকে। সেখানে তাঁকে ব্যাপক অর্থনৈতিক সমস্যায় ভুগতে হয়। চিচাওয়ান্তি এলাকার একটি সাইকেলের দোকানে কাজ করতে থাকেন। সেখানে তিনি গাড়ী এবং ডিজেল ট্রাক্টর মেকানিক হিসেবে ছিলেন। আর্থিক অসচ্ছলতা থাকা সত্ত্বেও সঙ্গীত চর্চা করতে থাকেন।
প্রত্যেহ রুটিনমাফিক দৈনিকভিত্তিতে গান চর্চা অব্যাহত রাখেন। তাঁর বাবা ওস্তাদ আজিম আলী খান এবং চাচা ওস্তাদ ইসমাইল খান ছিলেন ধ্রুপদী সংগীতের প্রখ্যাত পণ্ডিত। শৈশব থেকেই তিনি সঙ্গীত পরিবেশন করতেন। তাঁর জ্যেষ্ঠ ভাই উল্লেখ করেন যে প্রথম গান আনুষ্ঠানিকভাবে পরিবশন করেন ১৯৩৫ সালে। লাহোরের বেশ ক'টি অনুষ্ঠানে গান গাইলেন কিন্তু সাফল্য পেলেন না। তাতে দমে যান নি মেহেদী হাসান। ১৯৫৭ সালে রেডিও করাচি স্টুডিওতে অডিশনের সুযোগ আসে। অডিশনে গাইলেন ঠুমরি, রাগ খাম্বাজ, পিলু, দেশ, তিলক, কামোদ। রেডিও কর্মকর্তাদ্বয় - জেড.এ. বুখারী এবং রফিক আনোয়ার তাঁর গজল গানের অনুরক্ত হন। তাঁর গলার 'আকার'(signature) ঠুমরি ও গজলের জন্য মানানসই ছিল। তাই তিনি বিশুদ্ধ উচ্চাঙ্গ সংগীতের পরিবর্তে হালকা ক্ল্যাসিকাল ও গজলের দিকে মনোনিবেশ করেন। তাঁর গায়কির স্বতন্ত্র ধারা ও মিষ্টি কণ্ঠ স্রোতাদের নজর কাড়তে শুরু করে। মেহেদী হাসানের শিল্পীখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে দিকে দিকে।
মেহেদী হাসান পঁচিশ হাজারেরও বেশি গান গেয়েছেন। জিন্দেগিমে সাভি পিয়ার কিয়া কারতে হেয়, তেরে ভিগে বাদানকি খুশবু, পিয়ার ভারে দো শারমিলে নেয়ন—রোমান্টিক সংগীতে যেমন ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে তেমনি এক নায়ে মোড়পে, মুঝে তুম নাজারছে, ইক হুসনেকি দেবিছে মুঝে পেয়ার হুয়া থা গায়কির চূড়ান্ত মানদণ্ড বলে ধরা হয়। মেহেদী হাসান পপ স্টার ছিলেন না; কিন্তু ৭০ দশকের শেষের দিকে রবিন ঘোষের সুরে গাওয়া 'কাভি ম্যায় সোচতা হু', 'মুঝে দিলছে না ভুলানা' উপমহাদেশে ফিউশন মিউজিকের দ্বার খুলে দেয়।
মেহেদী হাসানের অনন্য গায়কির জন্য অত্যন্ত জটিল রাগ-রাগিনীও শিশুর সহজ-সরল মিষ্টি হাসির মতো স্রোতাদের হূদয়ে ঢেউ তোলে। মেহেদী হাসান সুদীর্ঘকাল সঙ্গীত ভুবনে অবস্থান করে অগণিত পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন। ১৯৭৯ সালে ভারতের জলন্ধরে সায়গল পুরস্কার এবং ১৯৮৩ সালে নেপাল থেকে গোর্খা দক্ষিণা বাহু পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি। এছাড়াও জেনারেল আইয়ুব খান কর্তৃক তমঘা-ই-ইমতিয়াজ; ১৯৮৫ সালে জেনারেল জিয়াউল হক দিয়েছেন প্রাইড অব পারফরম্যান্স; জেনারেল পারভেজ মুশাররফের কাছ থেকে হিলাল-ই-ইমতিয়াজ, নিগার পুরস্কার লাভ করেন।
১৯৮০-এর দশকের শেষার্ধ থেকে তিনি বিভিন্ন ধরনের অসুখ-বিসুখে আক্রান্ত হতে থাকেন। ফলে একান্তই বাধ্য হয়ে সঙ্গীত জগৎ ত্যাগ করেন মেহেদী হাসান। অবশেষে ২০১২ সালের ১৩ জুন করাচীর একটি বেসরকারি ক্লিনিকে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ৮৪ বছর।
কিংবদন্তি শিল্পী মেহেদী হাসান-এর জন্মদিনে আমরা গভীর শ্রদ্ধা জানাই।
তার কণ্ঠে গাওয়া প্রতিটি গজল, প্রতিটি সুর আজও সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে বেঁচে আছে, চিরকাল থাকবে।