সোমবার, আগস্ট ৩১, ২০২৬
 শিরোনাম
মধ্যপ্রাচ্যে ২৭টি মার্কিন ঘাঁটিতে আইআরজিসির হামলা সুনামগঞ্জ-এর ছাতক থানা পুলিশের অভিযানে নিয়মিত মামলার ৩ আসামি গ্রেফতার শাহ আমানত বিমানবন্দরে মধ্যপ্রাচ্যের ১০ ফ্লাইট বাতিল এনসিপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ, দেশজুড়ে কর্মসূচি বঙ্গোপসাগরে জলদস্যু দমনে প্রযুক্তিনির্ভর কঠোর নজরদারি-টহল প্রতিমন্ত্রী হয়ে নিজ এলাকায় নুরুল হক ইয়াবা ব্যবসায়ীদের এলাকা ছাড়ার হুঁশিয়ারি: টেকনাফে এমপি শাহজাহান চৌধুরী নগরবাসীর নিরাপত্তায় মধ্যরাতে রাস্তায় আইজিপি: আকস্মিক পরিদর্শনে কড়া বার্তা পাকিস্তান সীমান্তে আফগানিস্তানের হামলা, কাবুল-কান্দাহারে পাল্টা হামলা ফোন করে জামায়াত আমিরের স্বাস্থ্যের খোঁজ নিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

আজ কথা সাহিত্যিক, নাট্যকার, গীতিকার, উপন্যাসিক, চলচ্চিত্র পরিচালক "হুমায়ুন আহমেদ" এর মৃত্যুবার্ষিকী

আজ কথা সাহিত্যিক, নাট্যকার, গীতিকার, উপন্যাসিক, চলচ্চিত্র পরিচালক "হুমায়ুন আহমেদ" এর মৃত্যুবার্ষিকী

আজ কথা সাহিত্যিক, নাট্যকার, গীতিকার, উপন্যাসিক, চলচ্চিত্র পরিচালক "হুমায়ুন আহমেদ" এর মৃত্যুবার্ষিকী

গল্পের যাদুকর -হুমায়ূন আহমেদ""
সমরেশ মজুমদার দেখেছেন, স্রেফ হুমায়ূন আহমেদের- বইয়ে একটা সই পাওয়ার জন্য মানুষের-লম্বা লাইন। একদিন নয়, বহুদিন। কয়েক লক্ষ কপি মুহূর্তে বিক্রি হয়ে যায় তাঁর। বাংলাদেশে তখন হুমায়ূন আহমেদ মানেই জীবন্ত কিংবদন্তি। প্রকাশকরা তাঁর নাগাল পাওয়ার জন্য হত্যে দিয়ে পড়ে থাকে।

 

তিনি জীবনে দুটি জিনিসকে একদম কাছ থেকে দেখতে চেয়েছিলেন— জন্ম আর মৃত্যু। ভেতরে ভেতরে কি হিমুও বেড়ে উঠছিল? 
একবার এক ডাক্তার বন্ধুর কাছে গিয়ে রীতিমতো অনুনয়ের সুরে বললেন, যদি কোনো রোগী মৃত্যুশয্যায় থাকে, তাহলে তাঁকে যেন একবার ডাকা হয়। এমন শখ কেন? কারণ তিনি সামনে থেকে দেখতে চান মৃত্যুকে। সেই অনন্ত সম্ভাবনার সামনে পড়ে মানুষের রূপ কেমন করে বদলে যায়, সেটাই দেখবেন তিনি। সেইমতো একবার তাঁকে খবরও দেওয়া হল। রোগীর প্রায় শেষ অবস্থা। ডাক্তাররা আশা ছেড়েই দিয়েছেন। অদ্ভুত ব্যাপার, হুমায়ূন আহমেদ আসার খানিক পরেই ওই বৃদ্ধ রোগীর হাত ছেড়ে বিদায় নিল মৃত্যু। সুস্থ হয়ে উঠলেন তিনি। এ কেমন পরিহাস! ভাগ্য যে আরও বড়ো মঞ্চ তৈরি করে রেখেছে হুমায়ূনের জন্য। চোখের সামনে মারা গেল তাঁর ছোট্ট ছেলে।


নিজের স্পন্দনহীন ছেলের দেহ ধরে… 
বিদেশের দার্শনিকরা বলেন, পৃথিবীর ইতিহাস নাকি তৈরি করেছে পাগলরা। হুমায়ূন আহমেদ কি সেই পাগলদেরই এক শরিক ছিলেন? সবেমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নের অধ্যাপক হিসেবে ঢুকেছেন। বেতন খুব বেশি নয়। যে সরকারি বাড়িতে থাকেন, তাঁর ভাড়াও দেওয়া হয়নি বহুকাল। পুলিশ এসে নোটিশ ধরিয়ে গেছে। এমন অবস্থায় সিদ্ধান্ত নিলেন, বিয়ে করবেন। পাত্রী কিশোরী গুলতেকিন খান। সমস্ত বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে বিয়ে করলেনও; আর তারপরেই মাথার ওপর থেকে সরে গেল ছাদ। সরকারি আবাসন থেকে সপরিবারে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হলেন হুমায়ূন আহমেদ। তখন কে আর জানত, পরবর্তীকালে স্রেফ লিখে, ছবি পরিচালনা করে সেন্ট মার্টিন দ্বীপে একটি বাড়ি কিনে ফেলবেন!

 

অধ্যাপনার চাকরি ছেড়ে স্রেফ লেখালেখিকেই জীবন হিসেবে বাছলেন হুমায়ূন। সৃষ্টি হল একের পর এ, উপন্যাস। জন্ম হল ‘হিমু’, ‘মিসির আলি’র। দুই বাংলার বহু কিশোর-তরুণ আজও হিমু হতে চায়। পকেটহীন হলুদ পাঞ্জাবী পরে, এক অদ্ভুত ছেলে রাতের শহর দেখছে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘নীললোহিত’ যেমন কলকাতায়, তেমনই ঢাকার রাস্তায় হুমায়ূনের ‘হিমু’। জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। একুশে বইমেলায় পৌঁছে সমরেশ মজুমদার দেখেছেন, স্রেফ হুমায়ূন আহমেদের বইয়ে একটা সই পাওয়ার জন্য মানুষের লম্বা লাইন। একদিন নয়, বহুদিন। কয়েক লক্ষ কপি মুহূর্তে বিক্রি হয়ে যায় তাঁর। বাংলাদেশে তখন হুমায়ূন আহমেদ মানেই জীবন্ত কিংবদন্তি। প্রকাশকরা তাঁর নাগাল পাওয়ার জন্য হত্যে দিয়ে পড়ে থাকে। কিন্তু ওপার বাংলায়? নব্বইয়ের দশকেও হুমায়ূন আহমেদের নাম শোনেনি পশ্চিমবঙ্গের পাঠক। তাঁর গুটিকতক বই কেবল পাওয়া যেতো ওখানে। হিমু নিয়ে কোনো আবহাওয়াই তৈরি হয়নি কলকাতায়। অনেকসময় এই নিয়ে দুঃখপ্রকাশও করেছিলেন স্বয়ং স্রষ্টা। এক বাংলা এত কাছে টেনে নিল; আরেক বাংলা কেন এমন নিঃস্পৃহ?

 

প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ যখন প্রকাশিত হয়, তখন কোনোভাবে বইটি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও ‘দেশ’ পত্রিকার তৎকালীন সম্পাদক সাগরময় ঘোষের হাতে আসে। আর তারই রিভিউ করলেন সুনীল! তরুণ হুমায়ূনের চোখে ভরে উঠেছিল স্বপ্ন। তাহলে ‘দেশ’-এও তাঁর বইয়ের রিভিউ বেরোল! কিন্তু লেখা? তার জন্য অনেকটা অপেক্ষা করতে হয় হুমায়ূনকে। নব্বইয়ের দশক। কলকাতায় এসেছেন হুমায়ূন আহমেদ। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সাগরময় ঘোষের সঙ্গে একদিন আড্ডাও জমে উঠেছে। সেই সুযোগে মনের ইচ্ছেটা প্রকাশ করেই ফেললেন তিনি। ‘দেশ’-এ কি লেখার সুযোগ পাওয়া যাবে? পরবর্তীকালে সেই নব্বইয়ের দশকেই পত্রিকার শারদীয়া সংখ্যায় আত্মপ্রকাশ তাঁর। তারপর সেই পাতায় জায়গা পেয়েছে ‘হিমু’ও। একটু একটু করে পশ্চিমবঙ্গের পাঠকেরা পরিচিত হলেন এক বিস্ময় লেখনীর সঙ্গে।

 

কেবল লেখার মধ্যেই আটকে রাখেননি নিজেকে। নেমে পড়েছিলেন লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশনের জগতেও। নাটক থেকে শুরু করে সিনেমা, টেলিভিশন— সব জায়গায় তুলে ধরেছেন গল্পের সম্ভার। মনে পড়ে ‘বহুব্রীহি’ ধারাবাহিক নাটকের কথা। যখন এটি মুক্তি পায়, তখন গদিতে ছিল এরশাদ সরকার। ‘পাকিস্তানি হানাদার’, ‘রাজাকার’ এই শব্দগুলি একসময় জড়িয়ে ছিল মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে। এরশাদের সময় সেসব নিষিদ্ধ হয়ে গেল। কেউ সাহস করেও শব্দগুলি ব্যবহার করতে পারত না। আর সেখানেই অনন্য হুমায়ূন আহমেদ। ‘বহুব্রীহি’ নাটকেই উচ্চারিত হল ‘তুই রাজাকার’। বহু বছর পর বাংলাদেশ সাক্ষী থাকল এমন মুহূর্তের। তাও কে বলল? কোনো অভিনেতা নন, একটি টিয়াপাখি। মানুষ বললে তাঁর জীবনহানি হতে পারে, চিহ্নিতও করে ফেলা যাবে। কিন্তু টিয়াপাখি বললে?


শেষমেশ গোটা বাংলাদেশে শ্লোগানে পরিণত হয়ে গিয়েছিল ‘তুই রাজাকার’… 
সবই চলছিল। যেমন করে রাতের ফুটপাত ধরে ঘুরে বেড়ায় হিমুরা। কিন্তু সেখানে যোগ দিতে পারলেন না হুমায়ূন আহমেদ। নিজের ভেতর মৃত্যুর আওয়াজ যেন শুনতে পাচ্ছিলেন। গুলতেকিনের সঙ্গে বিচ্ছেদ হওয়ার পর বিয়ে করেছিলেন মেহের আফরোজ শাওন-কে। বয়সে অনেকটাই ছোটো; কিন্তু আত্মার মিলন কি আর বয়স দেখে হয়? এমন সময় হানা দিল ক্যানসার। হাসিমুখে দৈত্যকে মেনে নিলেন হুমায়ূন। এবার হিমুর কাছে যাওয়ার সময়। ১৯ জুলাই প্রয়াত হন হুমায়ূন আহমেদ। সালটা ২০১২।
এই দিনে আমাদের ছেড়ে পরপারে পারি জমিয়েছিলেন গল্পের জাদুকর। আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলী।