তিনি ৭৮ বছরে পা রাখছেন। তবে জন্মদিনকে ঘিরে তার নিজের কোনো বিশেষ আয়োজন নেই। তিনি জানান, ঘরোয়াভাবেই রাজধানীতে নিজ বাসায় জন্মদিন উদযাপিত হবে। নিজের জন্মদিন প্রসঙ্গে জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় বেশ মজা করেই বলেন, ‘আমি তো আসলে সব সময় নিজেকে ৩৩ বছরের একজন মানুষ মনে করি। আজ ৩৪-এ পা রাখব। মানুষের ভালোবাসাই আমাকে আজ এত দূর নিয়ে এসেছে। একজন শিল্পী হিসেবে আমি এখনো অতৃপ্ত। আমার মাঝে অতৃপ্তি রয়ে গেছে, সেটি আবৃত্তিতেও এবং অভিনয়েও। আমি আজীবন একজন শিক্ষার্থী। জন্মদিনে সবার কাছে আশীর্বাদ চাই যেন সুস্থ থাকি ভালো থাকি।’
জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় মূলত একজন আবৃত্তিশিল্পী। ১৯৬৯ সালে লেনিন জন্মশতবার্ষিকীতে কলকাতার রঞ্জি ইনডোর স্টেডিয়ামে তিনি নজরুল-তনয় কাজী সব্যসাচীর সঙ্গে দ্বৈত ও একক আবৃত্তি করেন। তিনি ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, স্কটল্যান্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একক আবৃত্তি অনুষ্ঠান করেছেন। আবৃত্তিশিল্পী হাবীবুল্লাহ সিরাজী একবার এক অনুষ্ঠানে জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়ের প্রশংসা করে বলেছিলেন, ‘রবীন্দ্র-পরবর্তী যুগেও বাংলা ভাষা নিয়ে যে কাজগুলো হচ্ছে, তাতে জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় একজন সক্রিয় অংশগ্রহণকারী।
রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিয়ে হয় না। মাইকেলকে বাদ দিয়ে হয় না। তবে রবীন্দ্রনাথকে শীর্ষে রেখে আমরা বাংলাদেশেও সাহিত্যে নবচর্চা করতে চাইছি। সেটি জোরদার হবে যাদের দিয়ে, সেই ধারক ও বাহকদের মধ্যে জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় অন্যতম।’ একই অনুষ্ঠানে রূপা চক্রবর্তী বলেছিলেন, ‘জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় আসলে আবৃত্তিসম্রাট। তিনি আমাদের ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিলেন। আবৃত্তি যে একটি চর্চার ব্যাপার, সেটা বুঝিয়েছেন জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়।’কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠকালীন শুরু হয় একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ।
পাঠ স্থগিত রেখেই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭০-এর দশকে ঢাকা এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে একাধিক একক আবৃত্তির অনুষ্ঠান করে জনপ্রিয়তা পান তিনি। আবৃত্তিকার হিসেবে তিনি শিল্পকলা পদক, গোলাম মুস্তাফা পদক, নরেন বিশ্বাস পদকসহ অনেক সম্মাননা অর্জন করেছেন। পাশাপাশি ১৯৭০-এর দশক থেকেই টিভি নাটকে অভিনয় শুরু করেন। আলমগীর কবিরের সান্নিধ্যে এসে চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেন। আশির দশকের মাঝামাঝি মোরশেদুল ইসলামের স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি সূচনাতে একটি চরিত্রে অভিনয় করেন। এর পর তারেক মাসুদের মাটির ময়না, রানওয়ে, হুমায়ূন আহমেদের ঘেঁটুপুত্র কমলা, নয় নম্বর বিপদসংকেতসহ বেশ কয়েকটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র এবং অসংখ্য টেলিভিশন নাটকে অভিনয় করেছেন।
তিনি ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশে প্রথম দর্শনীর বিনিময়ে একক আবৃত্তি অনুষ্ঠান করেন। বাংলাদেশে বৃন্দ আবৃত্তির (কয়্যার) সূচনা করেন তিনি।আবৃত্তির জন্য রাষ্ট্রের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা (একুশে পদক) পেয়েছেন। যে পদকের জন্য অনেকে অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকেন। কিন্তু তাদের দলে নিজেকে শামিল করতে নারাজ জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়। তার ভাষ্য, ‘আমি এ ধরনের প্রাপ্তিতে নিরাসক্ত। আমি জানিও না আমাকে দিয়েছে। যা হোক, বেটার লেট দ্যান নেভার। অন্তত আমার ছেলেমেয়েদের নিতে হয়নি, জীবিত অবস্থায় দিয়েছে, এটাই যথেষ্ট।’