আজ ৩১ জুলাই, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র, মঞ্চ, বেতার ও টেলিভিশন নাটকের এক প্রবাদপ্রতিম শিল্পী আমিনুল হক (আমিন)-এর প্রয়াণ দিবস। তাঁর অভিনয়, নাট্যচর্চা এবং সাংস্কৃতিক অবদান বাংলা নাটক ও চলচ্চিত্রের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
চলচ্চিত্রাঙ্গনে তিনি ‘আমিন’ নামেই অধিক পরিচিত ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন গুণী অভিনেতা, নাট্যকার, নির্দেশক এবং শিক্ষক। বাংলাদেশের অভিনয়শিল্পের বিকাশে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।
১৯২১ সালের ১ জুলাই অবিভক্ত বাংলার মালদহ জেলায় তাঁর জন্ম। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। মালদহ জিলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পর অভিনয়ের প্রতি গভীর অনুরাগ থেকেই সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁর পথচলা শুরু হয়।
১৯৪৪ সালে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী শ্রীরঙ্গম থিয়েটার-এ কিংবদন্তি নাট্যগুরু শিশির কুমার ভাদুড়ী-এর নির্দেশনায় তাঁর অভিনয়জীবনের সূচনা ঘটে। ১৯৪৬ সালে পরিচালক ফণী বর্মণ নির্মিত মন্দির চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি চলচ্চিত্রে আত্মপ্রকাশ করেন। একই সময়ে তিনি কলকাতা ও ঢাকা বেতারের শ্রুতিনাটকেও নিয়মিত অভিনয় করতেন।
অনেকেরই অজানা, অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি একজন দক্ষ ক্রীড়াবিদও ছিলেন। ১৯৪৪ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত কলকাতা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে প্রথম বিভাগ ফুটবলও খেলেছিলেন।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং ঢাকা বেতার-এ যোগ দেন। এরপর শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ সাংস্কৃতিক জীবন। ১৯৫৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম বাংলা সবাক চলচ্চিত্র 'মুখ ও মুখোশ'-এ তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন। এই চলচ্চিত্রটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক, আর সেই ইতিহাসের একজন অংশীদার ছিলেন আমিনুল হক।
১৯৫৭ সালে চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা (এফডিসি) প্রতিষ্ঠার পর পরিচালক ফতেহ লোহানী নির্মিত 'আকাশ আর মাটি' চলচ্চিত্রে দ্বিতীয় নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করে তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। এরপর একে একে তিনি ত্রিশেরও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন।
তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে—
মুখ ও মুখোশ, আকাশ আর মাটি, তোমার আমার, জোয়ার এলো, গোধূলীর প্রেম, অপরাজেয়, জয় বাংলা, এপার ওপার, জানোয়ার, অচেনা অতিথি, নাজমা এবং রাবেয়া।
শুধু চলচ্চিত্র নয়, নাট্যাঙ্গনেও তাঁর অবদান ছিল অসামান্য। ১৯৬১ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত বুলবুল একাডেমি অব ফাইন আর্টস (বাফা)-এর নাট্য বিভাগের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনের সূচনালগ্ন থেকেই তিনি অভিনেতা, নাট্যকার ও নির্দেশক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর অভিনয়, সংলাপ উপস্থাপন এবং চরিত্র নির্মাণ নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য ছিল শিক্ষণীয়।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অভিনেত্রী নাজমা (পিয়ারী বেগম)-কে বিয়ে করেন। মুখ ও মুখোশ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সময় তাঁদের পরিচয় হয়। তাঁদের একমাত্র সন্তান রবিউল আলম বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
বাংলাদেশের নাট্যকলায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯১ সালে তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন। এটি তাঁর দীর্ঘ সাংস্কৃতিক সাধনার সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিগুলোর একটি।
২০১১ সালের ৩১ জুলাই, ৯০ বছর বয়সে এই গুণী শিল্পী পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁর অভিনয়, শিল্পসাধনা এবং সাংস্কৃতিক অবদান আজও বাংলাদেশের নাটক ও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের হৃদয়ে অম্লান হয়ে আছে।
শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি শিল্পী আমিনুল হক (আমিন)-কে।
তাঁর কর্ম, শিল্পচেতনা এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার আগামী প্রজন্মের শিল্পীদের অনুপ্রেরণা জোগাবে।
তাঁর ১৫তম প্রয়াণ দিবসে জানাই গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।