বাংলাদেশের চলচ্চিত্রাঙ্গনের অন্যতম সফল নির্মাতা, প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, প্রযোজক এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর মুক্তিযোদ্ধা মনতাজুর রহমান আকবর-এর জন্মদিনে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও গভীর শ্রদ্ধা।
১৯৫৭ সালের ৩১ জুলাই জয়পুরহাট জেলার আক্কেলপুরে তাঁর জন্ম। বাবা ছিলেন একজন মৎস্য ব্যবসায়ী ও ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য এবং মা রুপজান বিবি ছিলেন গৃহিণী। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি নাট্যচর্চা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। আক্কেলপুর এফ.ইউ. পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৭৩ সালে এসএসসি, আক্কেলপুর এম.আর. ডিগ্রি কলেজ থেকে ১৯৭৫ সালে এইচএসসি এবং ১৯৭৭ সালে জয়পুরহাট ডিগ্রি কলেজ থেকে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের অধীনে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি ছাত্রজীবনেই অংশগ্রহণ করেন। শিলিগুড়ির পানিখনিতে প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর সেক্টর কমান্ডার কাজী নূরুজ্জামান-এর নেতৃত্বাধীন ৭ নম্বর সেক্টরে গ্রুপ কমান্ডার সাইদুর রহমানের অধীনে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেন। দেশের স্বাধীনতার জন্য তাঁর এই অবদান জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।
চলচ্চিত্র জীবনের সূচনা হয় ১৯৮০ সালে প্রখ্যাত পরিচালক আজিজুর রহমান-এর সহকারী হিসেবে কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘ছুটির ঘণ্টা’-তে কাজ করার মাধ্যমে। এরপর দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে ১৯৯১ সালে ‘ন্যায় যুদ্ধ’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
পরবর্তী সময়ে তিনি ঢালিউডে অ্যাকশন ও রোমান্টিক ঘরানার অসংখ্য ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র নির্মাণ করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর পরিচালিত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘চাকর’, ‘টাকার পাহাড়’, ‘প্রেম দিওয়ানা’, ‘ডিসকো ডান্সার’, *‘কুলি’*সহ আরও বহু জনপ্রিয় সিনেমা।
বাংলাদেশের জনপ্রিয় নায়ক মান্নাকে নিয়ে তিনি ২২টি এবং ডিপজলকে নিয়ে ২১টি সফল চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, যা বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য রেকর্ড। তাঁর হাত ধরেই চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে ডিপজল (খলনায়ক হিসেবে), চিত্রনায়িকা সাদিকা পারভিন পপি, কেয়া এবং ভারতীয় অভিনেত্রী রিয়া সেন-এর মতো জনপ্রিয় তারকাদের।
২০২২ সালে দেশের চলচ্চিত্র ঐতিহ্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে তিনি তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ ৫১টি চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভে দান করেন, যা ভবিষ্যৎ গবেষণা ও চলচ্চিত্রচর্চার জন্য এক মূল্যবান সংযোজন।
চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি তিনি
সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। ২০০০ সালে নিজ জন্মভূমি জয়পুরহাটের উন্নয়নের লক্ষ্যে আত্মীয়-স্বজনদের সহযোগিতায় ‘প্রচেষ্টা’ নামে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) প্রতিষ্ঠা করেন। এনজিও ফোরাম ও ডেমোক্রেসি ওয়াচের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠানটি স্যানিটেশনসহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে।
দীর্ঘ কর্মজীবনের পরও তিনি সৃজনশীলতায় থেমে থাকেননি। ২০২৩–২০২৪ সালেও ‘যেমন জামাই তেমন বউ’, ‘ঘর ভাঙা সংসার’ এবং ‘অমানুষ হলো মানুষ’-এর মতো চলচ্চিত্র পরিচালনার মাধ্যমে তিনি চলচ্চিত্রাঙ্গনে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি বজায় রেখেছেন।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, নতুন শিল্পী গড়ে তোলা এবং সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে তাঁর অবদান নিঃসন্দেহে অনুকরণীয়।
জন্মদিনে প্রখ্যাত এই নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার, প্রযোজক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মনতাজুর রহমান আকবরের সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করছি। শুভ জন্মদিন।