রবিবার, আগস্ট ২, ২০২৬
 শিরোনাম
মধ্যপ্রাচ্যে ২৭টি মার্কিন ঘাঁটিতে আইআরজিসির হামলা সুনামগঞ্জ-এর ছাতক থানা পুলিশের অভিযানে নিয়মিত মামলার ৩ আসামি গ্রেফতার শাহ আমানত বিমানবন্দরে মধ্যপ্রাচ্যের ১০ ফ্লাইট বাতিল এনসিপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ, দেশজুড়ে কর্মসূচি বঙ্গোপসাগরে জলদস্যু দমনে প্রযুক্তিনির্ভর কঠোর নজরদারি-টহল প্রতিমন্ত্রী হয়ে নিজ এলাকায় নুরুল হক ইয়াবা ব্যবসায়ীদের এলাকা ছাড়ার হুঁশিয়ারি: টেকনাফে এমপি শাহজাহান চৌধুরী নগরবাসীর নিরাপত্তায় মধ্যরাতে রাস্তায় আইজিপি: আকস্মিক পরিদর্শনে কড়া বার্তা পাকিস্তান সীমান্তে আফগানিস্তানের হামলা, কাবুল-কান্দাহারে পাল্টা হামলা ফোন করে জামায়াত আমিরের স্বাস্থ্যের খোঁজ নিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই, তবুও থেমে নেই সাতক্ষীরার উপকূলীয় মানুষের জীবন

প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই, তবুও থেমে নেই সাতক্ষীরার উপকূলীয় মানুষের জীবন

প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই, তবুও থেমে নেই সাতক্ষীরার উপকূলীয় মানুষের জীবন


ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও সুপেয় পানির সংকটের মধ্যেও সংগ্রাম আর আশার গল্প উপকূলবাসীর
আবু জাফর | সাতক্ষীরা প্রতিনিধিঃ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা সাতক্ষীরা। একদিকে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরের উত্তাল জলরাশি—এই দুইয়ের মাঝখানে গড়ে ওঠা উপকূলীয় জনপদ প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের পাশাপাশি দুর্যোগেরও অন্যতম কেন্দ্র। জেলার শ্যামনগর, আশাশুনি ও কালীগঞ্জ উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা বছরের পর বছর ধরে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করে টিকে আছে। প্রতিটি দিন যেন প্রকৃতির সঙ্গে এক নতুন যুদ্ধ, তবুও থেমে নেই এখানকার মানুষের জীবন।
 

উপকূলীয় অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ জীবিকা নির্বাহ করেন মাছ ধরা, চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষ, কৃষিকাজ, বনজ সম্পদ সংগ্রহ, দিনমজুরি, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও নৌপথে পরিবহনসহ নানা পেশার মাধ্যমে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রাকৃতিক পরিবেশে ব্যাপক পরিবর্তন দেখা দেওয়ায় তাদের জীবিকা আজ নানা সংকটে পড়েছে।
একসময় যেসব জমিতে সোনালি ধানের শীষ দুলত, এখন সেসব জমির অনেকটাই লবণাক্ত পানির প্রভাবে অনাবাদি হয়ে পড়ছে। কৃষকরা আগের মতো ফলন পাচ্ছেন না। ধান, পাট, শাকসবজি ও বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে কৃষিনির্ভর হাজারো পরিবার অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে কৃষি ছেড়ে মাছের ঘের বা অন্য পেশায় যুক্ত হচ্ছেন।
 

চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষ এই অঞ্চলের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হলেও সেটিও নানা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অতিরিক্ত লবণাক্ততা, ভাইরাসজনিত রোগ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং বেড়িবাঁধ ভেঙে ঘের প্লাবিত হওয়ার কারণে অনেক চাষি প্রতিবছর বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন। একটি ঘূর্ণিঝড়ই মুহূর্তের মধ্যে বছরের সব বিনিয়োগ শেষ করে দিতে পারে।
উপকূলের মানুষের আরেকটি বড় সংকট সুপেয় পানির অভাব। অধিকাংশ এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় টিউবওয়েলের পানি পানযোগ্য নয়। ফলে অনেক পরিবারকে কয়েক কিলোমিটার দূর থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হয়। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় ব্যয় করতে হয় শুধু বিশুদ্ধ পানির জন্য। কোথাও কোথাও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণই একমাত্র ভরসা।
 

স্বাস্থ্যসেবাও উপকূলবাসীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। দুর্গম এলাকার মানুষকে জরুরি চিকিৎসা নিতে অনেক দূর যেতে হয়। বর্ষা মৌসুমে যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও ভেঙে পড়ে। লবণাক্ত পানির কারণে চর্মরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি সমস্যা ও নানা পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময় উপকূলজুড়ে নেমে আসে আতঙ্ক। আইলা, সিডর, বুলবুল, আম্পান, ইয়াস, রেমালসহ একের পর এক ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতচিহ্ন এখনো বহন করছে সাতক্ষীরার উপকূল। দুর্যোগে ভেঙে যায় বেড়িবাঁধ, লোনা পানি ঢুকে প্লাবিত হয় গ্রাম, তলিয়ে যায় মাছের ঘের, কৃষিজমি ও বসতভিটা। হাজার হাজার পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়ে। অনেকেই আশ্রয়কেন্দ্রে দিন কাটান। দুর্যোগ শেষে আবার নতুন করে ঘর নির্মাণ, জমি চাষ ও জীবিকা পুনর্গঠনের কঠিন সংগ্রাম শুরু হয়।
 

নদীভাঙনও উপকূলের মানুষের স্থায়ী আতঙ্ক। কপোতাক্ষ, কালিন্দী, খোলপেটুয়া, ইছামতি ও অন্যান্য নদীর ভাঙনে প্রতিবছর বহু পরিবার তাদের বসতভিটা হারাচ্ছে। কেউ কেউ একাধিকবার স্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাস্তা ও কৃষিজমি।
সুন্দরবন উপকূলের মানুষের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। অনেক পরিবার বন থেকে মাছ, কাঁকড়া, গোলপাতা, মধু ও অন্যান্য বনজ সম্পদ সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তবে বনাঞ্চলে প্রবেশ মানেই জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলা। বাঘের আক্রমণ, কুমিরের হামলা, সাপের কামড় কিংবা নদীতে দুর্ঘটনায় প্রতিবছর অনেক মানুষ প্রাণ হারান অথবা গুরুতর আহত হন। তারপরও জীবিকার তাগিদে তাদের সেই ঝুঁকি নিয়েই বনমুখী হতে হয়।
শিক্ষাক্ষেত্রেও দুর্যোগের প্রভাব স্পষ্ট। অনেক সময় ঘূর্ণিঝড় বা জলাবদ্ধতার কারণে বিদ্যালয় বন্ধ থাকে। আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ফলে শিশুদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটে। দরিদ্র পরিবারের অনেক শিশু 

অর্থনৈতিক সংকটের কারণে অল্প বয়সেই শ্রমে যুক্ত হতে বাধ্য হয়।
তবে এত প্রতিকূলতার মাঝেও হার মানেননি উপকূলের মানুষ। তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা ও সংগ্রামের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন অভিযোজন কৌশল গ্রহণ করছেন। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, লবণসহিষ্ণু ধান ও সবজি চাষ, ভাসমান কৃষি, বিকল্প জীবিকার প্রশিক্ষণ, হাঁস-মুরগি ও ছাগল পালন, নারীদের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা এবং দুর্যোগ-সহনশীল ঘর নির্মাণের মতো উদ্যোগ তাদের নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।
সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা উপকূলে জলবায়ু অভিযোজন, নিরাপদ পানি সরবরাহ, কৃষি উন্নয়ন, দুর্যোগ প্রস্তুতি, সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ, সৌরবিদ্যুৎ, সামাজিক বনায়ন ও জীবিকা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এসব উদ্যোগ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা এখনও অপর্যাপ্ত বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
 

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, উপকূল রক্ষায় টেকসই ও উচ্চমানের বেড়িবাঁধ নির্মাণ, নদী খনন, নিরাপদ সুপেয় পানির স্থায়ী ব্যবস্থা, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, দুর্যোগ-সহনশীল আবাসন, আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা ও প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি সম্প্রসারণের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও বাড়াতে হবে।
পরিবেশ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব বহন করছে বাংলাদেশের উপকূলীয় জনগোষ্ঠী। অথচ এই পরিবর্তনের জন্য তাদের দায় প্রায় নেই বললেই চলে। তাই শুধু দুর্যোগের পর ত্রাণ নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বিজ্ঞানভিত্তিক অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ, নদী ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় জনগণের সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে উপকূলকে নিরাপদ ও বাসযোগ্য করে তোলা এখন সময়ের দাবি।
 

প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করেও সাতক্ষীরার উপকূলীয় মানুষ কখনো আশা ছাড়েন না। প্রতিটি ভোরে তারা নতুন স্বপ্ন নিয়ে আবারও জীবিকার সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। ঘূর্ণিঝড়ে ঘর ভাঙে, জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যায় ফসল, লবণাক্ততায় নষ্ট হয় জমি—তবুও তারা নতুন করে ঘুরে দাঁড়ান। সংগ্রাম, সাহস, ধৈর্য, পরিশ্রম ও অদম্য মনোবলই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। সেই শক্তিকে সঙ্গী করেই প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়ে এগিয়ে চলেছে সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদের জীবন যা শুধু একটি অঞ্চলের গল্প নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে মানবিক টিকে থাকার এক অনন্য উদাহরণ।