তাঁর পুরো নাম প্রণব ঘোষ খোকন। তবে সঙ্গীতাঙ্গনে তিনি প্রণব ঘোষ নামেই সমধিক পরিচিত।
১৯৫০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি যশোর শহরের মাইকপট্টি সংলগ্ন বাগমারা পাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি।
বাবা প্রফুল্ল ঘোষ ছিলেন একজন আইনজীবি এবং মাতা রত্না প্রভা ঘোষ ছিলেন গৃহিণী। পরিবারে মোট ৪ ভাই ও ৫ বোনের মধ্যে প্রণব ছিলেন সবার ছোট।
সত্তরের দশকে তিনি সাবিহা চৌধুরী চম্পাকে বিয়ের সময় ধর্মান্তরিত হয়ে মোহাম্মদ সফি প্রণব নাম ধারণ করেন। এক কন্যা সন্তান আছে এই দম্পতির। তবে সঙ্গীতে ও জীবনে তিনি সর্বাধিক পরিচিত ছিলেন জন্মনাম প্রণব ঘোষ নামেই।
তাঁর আদি পৈত্রিক নিবাস নড়াইলের কলাগাছিতে, নানা বাড়ী খুলনার বেলফুলিয়া গ্রামে। চাকরি করতেন পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে।
প্রণবের লেখাপড়া শুরু হয় যশোর সম্মিলনী ইনস্টিটিউট স্কুলে। এইচ. এস. সি এবং গ্রাজুয়েশন ডিগ্রী লাভ করেন যশোর সরকারী এম. এম. বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ হতে।
কলেজে পড়াকালীন বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রণব গানের শিল্পী হিসেবে আমন্ত্রিত হতেন।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ভারতে আশ্রয় নেন এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক হিসেবে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং আবারও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন।
১৯৭৯ সালে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে গেল। দেশের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মেজর জিয়া সহ তিন মন্ত্রী মাগুরায় আসলেন। যশোরের ডিসি মাগুরাতে একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে গানের শিল্পী হিসেবে প্রণব’কে পছন্দ করলেন। প্রণবের গান শুনে তৎকালিন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রী বি. চৌধুরী খুশী হলেন। প্রণব তখন ফ্যামিলি প্লানিংএ চাকরি করতেন। প্রণব যেন ঢাকায় অবস্থান করে তাঁর প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে পারেন এজন্য জনাব বি. চৌধুরী প্রণব’কে যশোর থেকে ঢাকাস্থ অফিসে বদলী করে নিয়ে আসলেন।
১৯৮১ সালে প্রণব ঘোষ প্রথম চলচ্চিত্রে গান করেন আবদুল্লাহ আল মামুনের চিত্রনাট্যে ‘এখনই সময়’ ছবিতে সেখসাদী খানের সুরে ‘আমি রাজ্জাক হইলাম না, আমি কবরী হইলাম না, আল্লাহ কেন নায়ক কইরা জন্ম দিল না।’ গানটি প্রচন্ড জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।
সুরকার হিসেবে তিনি তালিম নিয়েছেন উপমহাদেশের বিখ্যাত সুরকার দেবু ভট্টাচার্য, শেখ সাদী খান, আনোয়ার পারভেজ ও সুবল দাসগুপ্তের কাছে।
প্রণবের জীবনের প্রথম ক্যাসেটের শিল্পী ছিলেন উমা খান। পরবর্তীতে শিল্পী ছিলেন মুশরাত শবনব, শরীফ রানা ও শুভ্র দেব।
কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তাঁকে নিজের জায়গা করে নিতে হয়েছিল সঙ্গীতাঙ্গনে।
দেশে এবং দেশের বাইরে অনেক শিল্পীকে দিয়ে তিনি গান করিয়েছেন।
ভারতের কুমার শানু, আমাদের রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন, শাহনাজ রহ্মতুল্লাহ, এ্যান্ড্রু কিশোর, কুমার বিশ্বজিৎ, বেবী নাজনীন, কনক চাঁপা, মমতাজ, খালিদ হাসান মিলু, আইয়ুব বাচ্চু, রবি চৌধুরী, ডলি সায়ন্তনী, আঁখি আলমগীর, হাসানসহ বাংলাদেশের সমস্ত শিল্পীই তাঁর সুরে গান গেয়েছেন। পেয়েছেন প্রতিষ্ঠা। জনপ্রিয়তাও পেয়েছে তাঁর বহু গান।
চলচ্চিত্র ও আধুনিকসহ প্রায় তিনশোরও অধিক গানে সুরারোপ করেছেন তিনি। বাংলা গানে প্রণব ঘোষ সৃষ্টি করেছিলেন ভিন্ন এক ধারা।
তাঁর সুরে শেষ গানটি হচ্ছে ডিরেক্টর নার্গিস আক্তারের “মেঘের কোলে রোদ” ছায়াছবির।
সঙ্গীতাংঙ্গনে চির অমর হয়ে থাকবেন প্রয়াত
সুরশ্রষ্টা প্রনব ঘোষ......
১৬ আগস্ট ২০০৭ সালে চিরদিনের মতো স্তব্ধ হয়ে যায় এই সুরস্রষ্টার সুরের ঝঙ্কার। প্রিয় জন্মভূমি যশোরের মাটিতেই তিনি শায়িত আছেন।
তাঁর অমর সৃষ্টিগুলো আজও বাঙালির হৃদয়ে বেঁচে আছে— “এ মন আমার পাথর তো নয়, সব ব্যথা সয়ে যাবে নিরবে” “আমি সব কিছু ছাড়তে পারি, তোমাকে ছাড়তে পারব না” “অনেক বেদনাভরা আমার এ জীবন” “আমি আর ব্যথা পেতে চাই না”
এমন অসংখ্য গানই প্রমাণ করে তিনি ছিলেন বাংলা গানের এক অনন্য সুরশ্রষ্টা।
শ্রদ্ধাঞ্জলি এই অমর সঙ্গীতগুরু প্রণব ঘোষ-এর প্রতি। তাঁর সুরে বাংলা গান চিরকাল বেঁচে থাকবে।