শনিবার, আগস্ট ২৯, ২০২৬
 শিরোনাম
মধ্যপ্রাচ্যে ২৭টি মার্কিন ঘাঁটিতে আইআরজিসির হামলা সুনামগঞ্জ-এর ছাতক থানা পুলিশের অভিযানে নিয়মিত মামলার ৩ আসামি গ্রেফতার শাহ আমানত বিমানবন্দরে মধ্যপ্রাচ্যের ১০ ফ্লাইট বাতিল এনসিপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ, দেশজুড়ে কর্মসূচি বঙ্গোপসাগরে জলদস্যু দমনে প্রযুক্তিনির্ভর কঠোর নজরদারি-টহল প্রতিমন্ত্রী হয়ে নিজ এলাকায় নুরুল হক ইয়াবা ব্যবসায়ীদের এলাকা ছাড়ার হুঁশিয়ারি: টেকনাফে এমপি শাহজাহান চৌধুরী নগরবাসীর নিরাপত্তায় মধ্যরাতে রাস্তায় আইজিপি: আকস্মিক পরিদর্শনে কড়া বার্তা পাকিস্তান সীমান্তে আফগানিস্তানের হামলা, কাবুল-কান্দাহারে পাল্টা হামলা ফোন করে জামায়াত আমিরের স্বাস্থ্যের খোঁজ নিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

ম্যাচের কাঠি আর নকশি সুতায় দুর্গা, সাতক্ষীরায় প্রতিমা তৈরিতে নতুন চমক

ম্যাচের কাঠি আর নকশি সুতায় দুর্গা, সাতক্ষীরায় প্রতিমা তৈরিতে নতুন চমক

ম্যাচের কাঠি আর নকশি সুতায় দুর্গা, সাতক্ষীরায় প্রতিমা তৈরিতে নতুন চমক

আবু জাফর সাতক্ষীরা প্রতিনিধি

:আকাশে শরতের মেঘ, মাঠে কাশফুলের দোলা। এরই মধ্যে কানে আসছে শারদীয় দুর্গোৎসবের আগমনী বার্তা। পূজা সামনে রেখে সাতক্ষীরার বিভিন্ন মন্দির ও পূজামণ্ডপে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। কোথাও বাঁশ-খড়ের কাঠামো, কোথাও মাটির প্রলেপ, আবার কোথাও প্রতিমার মুখাবয়ব ও অলংকারে চলছে নিখুঁত কারুকাজ। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রতিমাশিল্পীরা।
তবে এবারের দুর্গোৎসবে সাতক্ষীরার সদর উপজেলার ধুলিহর-ব্রহ্মরাজপুর শ্রীশ্রী দুর্গাপূজা মণ্ডপের একটি প্রতিমা ঘিরে তৈরি হয়েছে বিশেষ কৌতূহল। মাটির অবয়বের ওপর দেড় লাখের বেশি ম্যাচের কাঠি ও ১০ কেজির বেশি রেশমি সুতা দিয়ে তৈরি হচ্ছে দেবী দুর্গা। সাধারণত আগুন জ্বালানোর কাজে ব্যবহৃত ম্যাচের কাঠিই শিল্পীর হাতের নিপুণতায় পেয়েছে ভিন্ন এক পরিচয়।
মাটির তৈরি প্রতিমার শরীরজুড়ে একের পর এক ম্যাচের কাঠি বসানো হচ্ছে। কোথাও পাশাপাশি, কোথাও আবার নির্দিষ্ট নকশায়। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে রেশমি সুতার সূক্ষ্ম কারুকাজ। এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি প্রতিমার কাজ। কাঠি ও সুতার কাজ শেষে দেওয়া হবে রঙের প্রলেপ। তখনই ফুটে উঠবে প্রতিমাটির পূর্ণ সৌন্দর্য।
চারজন শিল্পী এক মাসের বেশি সময় ধরে প্রতিমাটি তৈরির কাজ করছেন। পূজা কমিটির হিসাবে, শুধু শিল্পীদের পারিশ্রমিক বাবদ ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। বিশেষ উপকরণ, সময় ও শ্রমের কারণে এবারের প্রতিমা তৈরিতে ব্যয়ও হয়েছে তুলনামূলক বেশি।
প্রতিমাশিল্পী নবদ্বীপ সরকার বলেন, ২০২৩ সালে ভারতে গিয়ে একটি কারখানায় ম্যাচের কাঠি দিয়ে প্রতিমা তৈরির কাজ শিখেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার সাতক্ষিয়ায় নতুনভাবে কাজটি করার উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। ২০২৬ সালের দুর্গাপূজায় তাঁরা চারটি প্রতিমা তৈরি করছেন। এর মধ্যে ম্যাচের কাঠি ও রেশমি সুতার প্রতিমাটিই বিশেষ আকর্ষণ।
ম্যাচের কাঠি ব্যবহারে আগুনের ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও শিল্পীর দাবি, কাঠির ওপর বিশেষ ধরনের মেডিসিন প্রয়োগ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন বাতাসে থাকার কারণে কাঠির বারুদের কার্যকারিতাও নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে প্রতিমাটিতে আগুন লাগার আশঙ্কা নেই বলে দাবি তাঁর। 
ব্রহ্মরাজপুর পূজা কমিটির জন্য ব্যতিক্রমী প্রতিমা তৈরির উদ্যোগ অবশ্য এবারই প্রথম নয়। গত বছর দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করতে তারা ধান দিয়ে প্রতিমা তৈরি করেছিল। সেই প্রতিমা দেখতে পূজার কয়েক দিনজুড়ে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এসেছিলেন। দর্শনার্থীদের ব্যাপক সাড়া থেকেই এবার আরও নতুন কিছু করার পরিকল্পনা নেয় কমিটি।
ব্রহ্মরাজপুর শ্রীশ্রী দুর্গাপূজা উদযাপন কমিটির ক্যাশিয়ার অমিত ঘোষ বলেন, গত বছর ধানের প্রতিমা দেখতে প্রচুর মানুষ এসেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার কমিটি ও ভাস্করের সঙ্গে আলোচনা করে ম্যাচের কাঠি ও রেশমি সুতা দিয়ে প্রতিমা তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাঁদের মতে, এটি একটি ইউনিক আয়োজন।
প্রতিমার কাজ দেখতে প্রতিদিনই মণ্ডপে ভিড় করছেন স্থানীয় মানুষ। সাধারণ একটি ম্যাচের কাঠি কীভাবে শিল্পীর হাতে দেবীর অলংকারে পরিণত হচ্ছে, তা দেখতে আগ্রহী দর্শনার্থীরা মোবাইল ফোনে ছবি ও ভিডিও ধারণ করছেন।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, সাতক্ষীরা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক বিশ্বনাথ ঘোষ বলেন, গত বছর ব্রহ্মরাজপুর ইউনিয়নের একটি পূজামণ্ডপে ধান দিয়ে প্রতিমা তৈরি হয়েছিল। এবার তারা আরও ভিন্ন আঙ্গিকে ম্যাচের কাঠি দিয়ে প্রতিমা তৈরি করছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকেও দর্শনার্থীরা এই প্রতিমা দেখতে আসবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।vv
জেলার শ্যামনগর, কালীগঞ্জ, দেবহাটা, আশাশুনি, তালা ও কলারোয়াসহ বিভিন্ন এলাকাতেও চলছে প্রতিমা তৈরির কাজ। মাটি, খড় ও বাঁশের প্রচলিত কাঠামোর পাশাপাশি প্রতিমার সাজসজ্জায় যুক্ত হচ্ছে নানা ধরনের শিল্পভাবনা।
প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয় বাঁশ ও কাঠের কাঠামো দিয়ে। এরপর খড় দিয়ে দেওয়া হয় অবয়বের আকৃতি। কয়েক ধাপে মাটির প্রলেপ দিয়ে তৈরি করা হয় শরীরের গড়ন। মাটি শুকিয়ে গেলে শুরু হয় মুখাবয়ব ও অলংকারের সূক্ষ্ম কাজ। সবশেষে রং ও সাজসজ্জায় পূর্ণতা পায় দেবীর রূপ।
দুর্গাপূজাকে ঘিরে এই ব্যস্ততা শুধু ধর্মীয় আয়োজনেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিমা তৈরির সঙ্গে যুক্ত মৃৎশিল্পী, বাঁশ ও কাঠের কারিগর, রংমিস্ত্রি এবং সাজসজ্জার কারিগরদেরও কয়েক মাসের কর্মসংস্থান তৈরি হয়।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, সাতক্ষীরা জেলা শাখার তথ্য অনুযায়ী, এবার জেলায় ৫০০টির বেশি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি চলছে। উৎসবকে ঘিরে মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে প্যান্ডেল, আলোকসজ্জা ও নিরাপত্তা প্রস্তুতি।
একটি সাধারণ ম্যাচের কাঠি—যার কাজ আগুন জ্বালানো। শিল্পীর নিপুণ হাতে সেই কাঠিই এখন হয়ে উঠছে দেবীর অলংকার। দেড় লাখের বেশি ম্যাচের কাঠি, ১০ কেজির বেশি রেশমি সুতা আর চার শিল্পীর এক মাসের বেশি শ্রমে ব্রহ্মরাজপুরে তৈরি হচ্ছে দুর্গার এক ব্যতিক্রমী রূপ।
রঙের শেষ আঁচড় পড়ার পর সেই প্রতিমা কতটা বদলে যায়, সেটিই এখন দেখার অপেক্ষা। তবে তার আগেই নতুন এই আয়োজন সাতক্ষীরার দুর্গোৎসবে তৈরি করেছে আলাদা কৌতূহল—যেখানে ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে মিশেছে স্থানীয় কারুশিল্প, সৃজনশীলতা ও নতুন কিছু করার আকাঙ্ক্ষা।