শনিবার, আগস্ট ২৯, ২০২৬
 শিরোনাম
মধ্যপ্রাচ্যে ২৭টি মার্কিন ঘাঁটিতে আইআরজিসির হামলা সুনামগঞ্জ-এর ছাতক থানা পুলিশের অভিযানে নিয়মিত মামলার ৩ আসামি গ্রেফতার শাহ আমানত বিমানবন্দরে মধ্যপ্রাচ্যের ১০ ফ্লাইট বাতিল এনসিপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ, দেশজুড়ে কর্মসূচি বঙ্গোপসাগরে জলদস্যু দমনে প্রযুক্তিনির্ভর কঠোর নজরদারি-টহল প্রতিমন্ত্রী হয়ে নিজ এলাকায় নুরুল হক ইয়াবা ব্যবসায়ীদের এলাকা ছাড়ার হুঁশিয়ারি: টেকনাফে এমপি শাহজাহান চৌধুরী নগরবাসীর নিরাপত্তায় মধ্যরাতে রাস্তায় আইজিপি: আকস্মিক পরিদর্শনে কড়া বার্তা পাকিস্তান সীমান্তে আফগানিস্তানের হামলা, কাবুল-কান্দাহারে পাল্টা হামলা ফোন করে জামায়াত আমিরের স্বাস্থ্যের খোঁজ নিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

আজ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠসৈনিক, শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রবাদপ্রতিম গুরু ওস্তাদ মিহির লালা সাহা'র মৃত্যুবার্ষিকী

আজ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠসৈনিক, শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রবাদপ্রতিম গুরু ওস্তাদ মিহির লালা সাহা'র মৃত্যুবার্ষিকী

আজ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠসৈনিক, শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রবাদপ্রতিম গুরু ওস্তাদ মিহির লালা সাহা'র মৃত্যুবার্ষিকী

গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছি উপমহাদেশের প্রখ্যাত শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী, সংগীতসাধক, অসংখ্য শিল্পীর গুরু এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠসৈনিক ওস্তাদ মিহির লালা সাহাকে।
মিহির লালা ছিলেন এমন একজন শিল্পী, যাঁর জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ছিল সংগীতসাধনা, গুরু-শিষ্য পরম্পরা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং সংগীত শিক্ষার দীর্ঘ ঐতিহ্য। অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে তিনি শাস্ত্রীয় সংগীতের চর্চা, পরিবেশন ও শিক্ষাদানের মাধ্যমে দুই বাংলার সংগীতাঙ্গনে নিজের একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছিলেন। তাঁকে দুই বাংলার অন্যতম প্রখ্যাত শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী ও বহু গুণী শিল্পীর গুরু হিসেবে স্মরণ করা হয়।

 


১৯৪১ সালে কক্সবাজারে জন্মগ্রহণ করেন ওস্তাদ মিহির লালা সাহা। তাঁর পিতা ছিলেন আইনজীবী চন্দ্র বিনোদ লালা এবং মা কুলদাবালা লালা। আট ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। জন্ম কক্সবাজারে হলেও তাঁর শৈশব ও বেড়ে ওঠার বড় অংশ কেটেছে চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর কানুনগোপাড়ার পোপাদিয়া গ্রামে।

 

ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি তাঁর ছিল গভীর আকর্ষণ। সংগীতে তাঁর হাতেখড়ি হয় ওস্তাদ আবু বক্কর সিদ্দিকীর কাছে। পরবর্তীতে তিনি উপমহাদেশের একাধিক প্রখ্যাত সংগীতগুরুর কাছে তালিম গ্রহণ করেন। তাঁদের মধ্যে ওস্তাদ ফজলে হক, ওস্তাদ নীরদ বরণ বড়ুয়া, পণ্ডিত নারায়ণ চন্দ্র বসাক, ওস্তাদ বারীন মজুমদারসহ আরও অনেক গুণী সাধকের নাম উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে পণ্ডিত বারীন মজুমদারের সান্নিধ্য তাঁর সংগীতজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

 

সংগীতশিক্ষা ও সাধনা-
শাস্ত্রীয় সংগীতকে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন মিহির লালা। তিনি ভারতের অল ইন্ডিয়া মিউজিক কলেজ থেকে ‘প্রফেসর অব ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিক’ ডিগ্রি অর্জন করেন। দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় তিনি সংগীতের সাধনা ও শিক্ষাদানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

 

তিনি শুধু নিজে সংগীত পরিবেশন করেননি, অসংখ্য শিল্পীকে শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম দিয়ে গড়ে তুলেছেন। গুরু-শিষ্য পরম্পরার প্রতি তাঁর ছিল গভীর আস্থা। তাঁর শিষ্যদের অনেকেই পরবর্তীকালে সংগীতাঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী ‘আর্য্য সংগীত সমিতি’ এবং ‘সুরেন্দ্র সংগীত বিদ্যাপীঠ’-এর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত নিবিড়। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি এই দুই ঐতিহ্যবাহী সংগীত শিক্ষাকেন্দ্রের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
মহান মুক্তিযুদ্ধে শব্দসৈনিক-
মিহির লালার জীবনের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়গুলোর একটি হলো ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ।

 

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে তিনি যুক্ত হয়েছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠসৈনিক হিসেবে। তাঁর কণ্ঠ ও সংগীত তখন শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না—তা হয়ে উঠেছিল মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা এবং স্বাধীনতাকামী মানুষের মনোবল জাগিয়ে তোলার শক্তিশালী মাধ্যম।


মুক্তিযুদ্ধের সেই উত্তাল সময়ে শিল্পীদের কণ্ঠে উচ্চারিত গান ও কথামালা যেমন মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস জুগিয়েছিল, তেমনি অবরুদ্ধ বাংলাদেশের মানুষের মনে জাগিয়েছিল স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। মিহির লালা সেই ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক সংগ্রামের একজন নিবেদিত কণ্ঠসৈনিক ছিলেন।
সম্মাননা ও স্বীকৃতি-

 

শাস্ত্রীয় সংগীতের সাধনা এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় সাংস্কৃতিক অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বিভিন্ন সম্মাননা লাভ করেন। ২০১৮ সালে জাতীয় শিল্পকলা একাডেমি পদকে ভূষিত হন এই গুণী শিল্পী।

 

তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন অবশ্য কোনো পদক বা পুরস্কার নয়—শাস্ত্রীয় সংগীতের যে জ্ঞান ও সাধনা তিনি পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন, সেটিই তাঁর অমর উত্তরাধিকার।


পারিবারিক জীবন-
সংগীত ছিল তাঁর পরিবারেরও অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর স্ত্রী জয়ন্তী লালা ছিলেন একজন বিশিষ্ট নজরুলসংগীতশিল্পী এবং তিনিও সংগীতচর্চা ও শিক্ষাদানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের মেয়ে চন্দ্রিমা লালা ভারতের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংগীতে ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁদের ছেলে সুমন লালা একজন কম্পিউটার প্রকৌশলী।
দীর্ঘ সংগীতজীবনের অবসান ঘটিয়ে ২০২৪ সালের ১৭ আগস্ট তিনি চট্টগ্রামের নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর আগে তিনি চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে কিছুদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাঁর প্রয়াণে বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গন হারায় একজন নিবেদিতপ্রাণ সাধক, শিক্ষক ও গুরুজনকে।

 

ওস্তাদ মিহির লালা সাহা ছিলেন সেই প্রজন্মের শিল্পী, যাঁদের কাছে সংগীত ছিল শুধু পেশা নয়—ছিল সাধনা, সংস্কৃতি ও মানুষের মুক্তির সঙ্গে যুক্ত এক জীবনদর্শন।
তাঁর কণ্ঠে ছিল মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, তাঁর সাধনায় ছিল শাস্ত্রীয় সংগীতের ঐতিহ্য, আর তাঁর শিক্ষকতায় ছিল পরবর্তী প্রজন্মের জন্য জ্ঞানের উত্তরাধিকার।

 

তিনি চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর শিষ্যদের কণ্ঠে, সংগীতের সুরে এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ইতিহাসে তাঁর অবদান বেঁচে থাকবে দীর্ঘকাল।
গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি মহান মুক্তিযুদ্ধের কণ্ঠসৈনিক, শাস্ত্রীয় সংগীতের সাধক ও অসংখ্য শিল্পীর শ্রদ্ধেয় গুরু ওস্তাদ মিহির লালা সাহাকে।
সুরের সাধক, মুক্তিযুদ্ধের কণ্ঠসৈনিক—আপনাঅর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
ওস্তাদ মিহির লালা সাহা অমর হয়ে থাকুন তাঁর সৃষ্টির মধ্যে, তাঁর শিষ্যদের কণ্ঠে এবং বাংলার সংগীতের ইতিহাসে।