নির্বাক চলচ্চিত্রের যুগ থেকে সবাক চলচ্চিত্র—ভারতীয় সিনেমার একেবারে শুরুর সেই উত্তাল সময়ের অন্যতম পরিচিত মুখ ছিলেন পদ্মা দেবী। অভিনেত্রী হিসেবে যেমন তিনি নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছিলেন, তেমনই গায়িকা হিসেবেও প্রাথমিক সবাক চলচ্চিত্রে তাঁর প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়। শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে রেখে গেছেন এক দীর্ঘ ও উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
পদ্মা দেবীর প্রকৃত নাম ছিল নীলিমা। ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ ভারতের বাংলায় তাঁর জন্ম। তাঁর পৈতৃক পরিবারের শিকড় ছিল মাদারিপুরে, যা বর্তমানে বাংলাদেশের অন্তর্গত। পরবর্তীকালে ব্যক্তিগত জীবনের নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে তিনি চলচ্চিত্রজগতে প্রবেশ করেন।
১৯৩১ সালে ধীরুভাই দেশাই পরিচালিত নির্বাক চলচ্চিত্র ‘Sea Goddess’ (Dariai Devangana)-এর কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তাঁর চলচ্চিত্রজীবনের সূচনা। এই ছবিটি সারোজ ফিল্ম কোম্পানির প্রযোজনায় নির্মিত হয়েছি।
নির্বাক যুগের পর তিনি হিন্দি চলচ্চিত্রেও নিয়মিত কাজ শুরু করেন। ত্রিশের দশকে বোম্বাইয়ের চলচ্চিত্রজগতে তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে এবং তিনি একাধিক স্টান্ট ও অ্যাকশনধর্মী ছবিতে অভিনয় করেন। জে. বি. এইচ. ওয়াডিয়ার ‘The Amazon’ (1933) ছবিতে তাঁকে মুখ্য ভূমিকায় দেখা যায়। এই সময়েই তিনি ভারতীয় সিনেমার প্রথমদিকের নারী অ্যাকশন তারকাদের একজন হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
বাংলা চলচ্চিত্রে পদচারণা-
বাংলা চলচ্চিত্রেও পদ্মা দেবীর উপস্থিতি ছিল দীর্ঘস্থায়ী। ‘তরুণী’-সহ একের পর এক ছবিতে অভিনয় করে তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শকের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন। Bengal Film Archive-এর সংরক্ষিত ফিল্মোগ্রাফিতে তাঁর অভিনীত ‘তরুণী’, ‘শাপমুক্তি’, ‘বাংলার মেয়ে’, ‘অভিসার’, ‘ছদ্মবেশী’, ‘মাটির ঘর’, ‘জলসাঘর’, ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’-সহ অসংখ্য ছবির উল্লেখ রয়েছে।
বিশেষ করে সত্যজিৎ রায়ের কালজয়ী ‘জলসাঘর’ (১৯৫৮) ছবিতে তাঁর অভিনয় তাঁকে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে আরও স্মরণীয় করে রেখেছে। ছবিতে তিনি মহামায়া চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।
পরবর্তীকালে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে নায়িকার ভূমিকায় সীমাবদ্ধ না থেকে তিনি চরিত্রাভিনেত্রী হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’, ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’, ‘প্রথম কদম ফুল’, ‘এখনই’, ‘জন অরণ্য’, ‘দেবদাস’-সহ বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য ছবিতে তাঁর উপস্থিতি দেখা যায়।
‘কিষাণ কন্যা’ ও ভারতীয় রঙিন চলচ্চিত্রের ইতিহাস-
পদ্মা দেবীর চলচ্চিত্রজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ‘কিষাণ কন্যা’ (১৯৩৭)।
মতি বি. গিদওয়ানি পরিচালিত এবং আরদেশির ইরানি প্রযোজিত এই হিন্দি ছবিতে পদ্মা দেবী বাঁসরি চরিত্রে অভিনয় করেন। ছবিটির কাহিনি ও চিত্রনাট্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বিখ্যাত লেখক সাদাত হাসান মান্টো।
‘কিষাণ কন্যা’কে সাধারণত ভারতের প্রথম দেশীয়ভাবে নির্মিত পূর্ণদৈর্ঘ্য রঙিন চলচ্চিত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এর আগে ‘সৈরন্ধ্রী’ (১৯৩৩)-তে রঙিন দৃশ্য থাকলেও সেটি জার্মানিতে প্রসেস ও প্রিন্ট করা হয়েছিল। ‘কিষাণ কন্যা’ ছিল ভারতে সম্পূর্ণভাবে নির্মিত রঙিন চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক মাইলফলক।
এই ছবিতে নায়িকার ভূমিকায় পদ্মা দেবীর উপস্থিতি তাঁকে সেই সময়ের চলচ্চিত্র ইতিহাসে বিশেষ মর্যাদা এনে দেয়। পরবর্তীকালে তাঁকে ‘Colour Queen’ হিসেবেও অভিহিত করা হয়েছে।
🎶 অভিনেত্রীর পাশাপাশি গায়িকাও
পদ্মা দেবীর প্রতিভা শুধু অভিনয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রাথমিক সবাক চলচ্চিত্রের যুগে তিনি প্লেব্যাক ও গান পরিবেশনেও অংশ নেন।
তাঁর কণ্ঠ শোনা যায়—
সতী মহানন্দা (১৯৩৩)
মহারানি (১৯৩৪)
বেহেন কা প্রেম (১৯৩৫)
সংদিল সমাজ (১৯৩৬)
কিষাণ কন্যা (১৯৩৭)
জামানা (১৯৩৮)
অর্থাৎ অভিনয় ও সংগীত—দুই ক্ষেত্রেই তিনি নিজের বহুমুখী প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিলেন।
পদ্মা দেবীর কর্মজীবন কেবল বাংলা বা হিন্দি চলচ্চিত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না। বাংলা, হিন্দি/হিন্দুস্তানি এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক চলচ্চিত্রে কাজ করার সুবাদে তিনি নিজেকে একজন বহুভাষিক শিল্পী হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। বাংলা চলচ্চিত্রে দীর্ঘ সময় কাজ করার পাশাপাশি বোম্বাইয়ের চলচ্চিত্রজগতেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি ছিল।
তাঁর দীর্ঘ অভিনয়জীবনে শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয়ের তথ্য বিভিন্ন চলচ্চিত্র-তথ্যভাণ্ডারে পাওয়া যায়। IMDb-তেও তাঁর নামে ১২৩টি অভিনয়-ক্রেডিট তালিকাভুক্ত রয়েছে।
জীবনের শেষপর্যায় পর্যন্ত পদ্মা দেবী বাংলা চলচ্চিত্রে চরিত্রাভিনয় করে গেছেন। ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগ থেকে ১৯৮০-এর দশকের গোড়ার দিকেও তাঁর অভিনীত বেশ কিছু ছবির তথ্য পাওয়া যায়—যার মধ্যে ‘দেবদাস’ (১৯৭৯), ‘উপলব্ধি’ (১৯৮১), ‘মা ভবানী মা আমার’ (১৯৮২) উল্লেখযোগ্য।
১৯৮৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় তাঁর জীবনাবসান ঘটে।
আজ তাঁর ১০৯তম জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি ভারতীয় চলচ্চিত্রের সেই অগ্রদূত শিল্পীকে—যিনি নির্বাক যুগের পর্দা থেকে সবাক চলচ্চিত্র, স্টান্ট সিনেমা থেকে সামাজিক ছবি, অভিনয় থেকে সংগীত—বহু ক্ষেত্রেই নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন।
পদ্মা দেবীর মতো শিল্পীদের অবদান ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসের প্রারম্ভিক অধ্যায়কে বুঝতে আজও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময়ের স্রোতে তাঁর নাম হয়তো অনেকটাই আড়ালে চলে গেছে, কিন্তু ভারতীয় সিনেমার শিকড়ের ইতিহাসে তাঁর অবদান কখনও মুছে যাওয়ার নয়।
কিংবদন্তি অভিনেত্রী পদ্মা দেবীর ১০৯তম জন্মবার্ষিকীতে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা ও গভীর ভালোবাসা।