অরুণা ইরানি—ভারতীয় চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন জগতের এমন এক উজ্জ্বল নাম, যাঁর অভিনয়জীবন বিস্তৃত ছয় দশকেরও বেশি সময়। নায়িকা, পার্শ্বচরিত্রের অভিনেত্রী, খলচরিত্র, কমেডি—বহু ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি ভারতীয় দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন।
আজ এই গুণী শিল্পীর জন্মদিন।
ভারতের বোম্বে শহরে অরুণা ইরানির জন্ম। তাঁর বাবা ফারিদুন ইরানি একটি নাট্যদল পরিচালনা করতেন এবং মা সগুনা ছিলেন একজন অভিনেত্রী। ফলে ছোটবেলা থেকেই অভিনয় ও মঞ্চজগতের পরিবেশের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে।
আট ভাইবোনের মধ্যে অরুণা ছিলেন জ্যেষ্ঠ। পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে তিনি ষষ্ঠ শ্রেণির পর আর প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। কিন্তু শিক্ষাজীবনের সীমাবদ্ধতা তাঁর স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। খুব অল্প বয়সেই অভিনয়কে জীবনের পেশা হিসেবে বেছে নেন।
তাঁর পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য পরবর্তীতে চলচ্চিত্র ও বিনোদনজগতের সঙ্গে যুক্ত হন। ভাই ইন্দ্র কুমার প্রযোজক ও পরিচালক হিসেবে পরিচিতি পান; অন্য ভাইদের মধ্যেও কেউ অভিনয় ও চলচ্চিত্র প্রযোজনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
শিশুশিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্রে অভিষেক -
মাত্র ১৫ বছর বয়সে, ১৯৬১ সালে কিংবদন্তি চলচ্চিত্র ‘গঙ্গা যমুনা’-তে শিশুশিল্পী হিসেবে অরুণা ইরানির চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে।
এরপর ধীরে ধীরে তিনি হিন্দি চলচ্চিত্রে নিজের জায়গা তৈরি করতে শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে হিন্দি, কন্নড়, মারাঠি ও গুজরাটি ভাষার চলচ্চিত্রেও কাজ করেন।
তাঁর অভিনয়জীবনের ব্যাপ্তি এত দীর্ঘ যে পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ভারতীয় বিনোদনজগতের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।
মেহমুদের সঙ্গে জনপ্রিয় জুটি -
ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে বিখ্যাত অভিনেতা ও কমেডিয়ান মেহমুদ-এর সঙ্গে অরুণা ইরানির জুটি দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।
তাঁদের অন-স্ক্রিন উপস্থিতিতে কমেডি, প্রাণবন্ত অভিনয় ও স্বতঃস্ফূর্ততা ছিল অন্যতম আকর্ষণ। এই জুটির সাফল্য অরুণা ইরানির ক্যারিয়ারে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
নায়িকা থেকে চরিত্রাভিনেত্রী -
অরুণা ইরানির ক্যারিয়ারের অন্যতম বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি নিজেকে কোনো একটি ধরনের চরিত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি।
কখনো তিনি নায়িকার ভূমিকায়, কখনো মায়ের চরিত্রে, কখনো খলচরিত্রে, আবার কখনো হাস্যরসাত্মক চরিত্রে অভিনয় করেছেন।
বিশেষ করে মা, শাশুড়ি, আত্মীয়, সমাজের নেতিবাচক চরিত্র কিংবা শক্তিশালী পার্শ্বচরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়।
তাঁর অভিনয়ের শক্তি ছিল চরিত্রকে নিজের মতো করে জীবন্ত করে তোলা। পর্দায় কয়েক মিনিটের উপস্থিতিতেও তিনি অনেক সময় প্রধান চরিত্রগুলোর সমান দর্শকপ্রতিক্রিয়া পেয়েছেন।
স্মরণীয় কিছু চলচ্চিত্র -
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অরুণা ইরানি অসংখ্য জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে—
* কারাফান (Caravan)
* ববি (Bobby)
* বোম্বে টু গোয়া (Bombay to Goa)
* রাজা বাবু (Raja Babu)
* দিল তো পাগল হ্যায় (Dil To Pagal Hai)
এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে তিনি অমিতাভ বচ্চন, ঋষি কাপুর, ধর্মেন্দ্র, জিতেন্দ্র, রাজেশ খান্না, গোবিন্দাসহ ভারতীয় চলচ্চিত্রের বহু জনপ্রিয় তারকার সঙ্গে অভিনয় করেছেন।
ফিল্মফেয়ারে অসাধারণ সাফল্য -
অরুণা ইরানির অভিনয় প্রতিভার অন্যতম বড় স্বীকৃতি এসেছে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার থেকে।
১৯৮৪ সালে Pet Pyaar Aur Paap চলচ্চিত্রের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেত্রী বিভাগে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার লাভ করেন।
এরপর ১৯৯২ সালে Beta চলচ্চিত্রে তাঁর অসাধারণ অভিনয়ের জন্য একই বিভাগে আবারও ফিল্মফেয়ার পুরস্কার অর্জন করেন।
শুধু পুরস্কার জয় নয়, শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেত্রী বিভাগে ১০ বার ফিল্মফেয়ার মনোনয়ন পাওয়ার কৃতিত্বও তাঁর দীর্ঘ ও সফল ক্যারিয়ারের একটি উল্লেখযোগ্য দিক।
আজীবন সম্মাননা -
দীর্ঘ অভিনয়জীবনের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১২ সালে ৫৭তম ফিল্মফেয়ার পুরস্কার অনুষ্ঠানে অরুণা ইরানিকে প্রদান করা হয় ফিল্মফেয়ার লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড।
এই সম্মান তাঁর কয়েক দশকের অসাধারণ অভিনয়জীবনের যথার্থ স্বীকৃতি।
ছোট পর্দাতেও সমান জনপ্রিয় -
শুধু বড় পর্দা নয়, অরুণা ইরানি ভারতীয় টেলিভিশনেও নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন।
বিভিন্ন জনপ্রিয় হিন্দি ধারাবাহিকে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করে তিনি ঘরে ঘরে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। ‘Des Mein Niklla Hoga Chand’-সহ একাধিক জনপ্রিয় টেলিভিশন সিরিয়ালে তাঁর অভিনয় দর্শকদের প্রশংসা পেয়েছে।
চলচ্চিত্র থেকে টেলিভিশন—মাধ্যম পরিবর্তন হলেও তাঁর অভিনয়ের স্বাতন্ত্র্য কখনো হারিয়ে যায়নি।
পাঁচ দশকের বেশি সময়ের অভিনয়জীবন
অরুণা ইরানির ক্যারিয়ার ভারতীয় চলচ্চিত্রের এক বিশাল পরিবর্তনের সাক্ষী।
সাদাকালো যুগের চলচ্চিত্র থেকে রঙিন সিনেমা, মসালা ফিল্ম থেকে আধুনিক বলিউড, বড় পর্দা থেকে টেলিভিশনের জনপ্রিয় ধারাবাহিক—প্রায় প্রতিটি সময়ের সঙ্গেই তিনি নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন।
তাঁর অভিনয়জীবনে শত শত চলচ্চিত্র রয়েছে এবং বিভিন্ন সূত্রে তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্রের সংখ্যা ৫০০-এরও বেশি বলে উল্লেখ করা হয়।
একজন শিল্পীর জন্য এত দীর্ঘ সময় ধরে দর্শকের ভালোবাসা ধরে রাখা নিঃসন্দেহে বিরল কৃতিত্ব।
জন্মদিনে শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা
অরুণা ইরানি শুধু একজন অভিনেত্রী নন; তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রের এক জীবন্ত ইতিহাস। পার্শ্বচরিত্রকে কীভাবে প্রধান চরিত্রের মতো স্মরণীয় করে তোলা যায়, তাঁর অভিনয়জীবন তার উজ্জ্বল উদাহরণ।
প্রতিভা, পরিশ্রম, বহুমুখী অভিনয় এবং দীর্ঘ কর্মজীবনের মাধ্যমে তিনি ভারতীয় বিনোদনজগতে নিজের একটি স্থায়ী অধ্যায় তৈরি করেছেন।
জন্মদিনে এই কিংবদন্তি শিল্পীর প্রতি রইল আন্তরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।আপনার সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও আনন্দময় জীবন কামনা করি।
আপনার অভিনয়ের অসংখ্য স্মরণীয় চরিত্র আগামী প্রজন্মের দর্শকদের কাছেও চিরকাল বেঁচে থাকুক। অরুণা ইরানি—নামটি শুধু একজন অভিনেত্রীর নয়, ভারতীয় চলচ্চিত্রের এক দীর্ঘ ও গৌরবময় অধ্যায়ের নাম।