আক্তারুল ইসলাম, জেলা প্রতিনিধি, কুষ্টিয়া।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় আবাসিক হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ৯ জনের মধ্যে একই পরিবারের রয়েছেন চারজন। এখন পর্যন্ত নিহতদের মধ্যে ৬ জনের পরিচয় জানা গেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন কুষ্টিয়ার দেবাশিস দত্ত (৩৯), তার আড়াই বছর বয়সী শিশু শর্ণশিষ দত্ত, স্ত্রী আফসানা শিম্মিন (২৭) ও শ্বশুর আকরাম আলী (৬৪)।
নিহত দেবাশীষ দত্ত চ্যানেল নাইন ও আজকের পত্রিকার কুষ্টিয়া প্রতিনিধি ছিলেন। স্থানীয় দৈনিক আজকের আলো পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করতেন।
তাদের কলকাতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে রাখা হয়েছে। মঙ্গলবার রাত ২টার দিকে কলকাতার অন্যতম ব্যস্ত ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা নিউ মার্কেটের কাছে মির্জা গালিব স্ট্রিটের হোটেল শিখা ইনে এই আগুন লাগে।
দেবাশিস দত্তের বাড়ি কুষ্টিয়া মডেল থানার মোহিনী মিল এলাকার আরুয়াপাড়ায়। তার বাবার নাম দিলীপ কুমার দত্ত। আকরাম আলীর বাড়ি কুষ্টিয়া হেড পোস্ট অফিস এলাকার বদরুদ্দোজা রোডে।
নিহত আহামেদ বাবুর বাড়ি ঢাকার সাভারের আমিনবাজারের বেগুনবাড়িতে। তার বাবার নাম আদম আলী।
এছাড়া ১৯ বছর বয়সী সন্দীপ পাসওয়ান নামে আরেকজনের পরিচয় মিলেছে। তিনি ভারতের ঝাড়খণ্ডের গিরিডি জেলার বাসিন্দা।
অপর তিনজনের পরিচয় এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আগুনের সময় ওই হোটেলে ২৫ জন বাংলাদেশি ছিলেন।
কলকাতায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ৮ জন বাংলাদেশির মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে। সংবাদ সংস্থা এএনআই জানিয়েছে, নিহতরা চিকিৎসার জন্য কলকাতায় এসেছিলেন।
পুলিশ জানিয়েছে, হোটেলের তিন তলায় রাত ২টা ৭ মিনিটে আগুন লাগে। আগুন ছড়িয়ে পড়ে অন্তত চারটি ঘরে। চিৎকার চেঁচামেচি শুনে ঘুম ভেঙে যায় হোটেলের বাসিন্দাদের। আগুন দ্রুত আশেপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে হোটেলের কক্ষগুলো ঘন কালো ধোঁয়ায় ভরে যায়। এতে হোটেলের বাসিন্দা আতঙ্কিত হয়ে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করেন। জীবন বাঁচাতে হুড়োহুড়ি করে বাইরে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেন। তবে ধোঁয়ার কারণে হোটেল থেকে বের হওয়ার সুযোগ পাচ্ছিলেন না তারা। অনেকেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
রাত ২টা ৭ মিনিটে ফায়ার সার্ভিসকে অগ্নিকাণ্ডের বিষয়টি জানানো হয়। খবর পাওয়ার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের ৪টি ইঞ্জিন দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। এর পাশাপাশি একটি বিপর্যয় মোকাবিলা দলও (ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট টিম) উদ্ধার কাজে যোগ দেয়। দমকলকর্মীরা ভবনের ভেতরে আটকে পড়া মানুষদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। দুই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। আগুনে হোটেলের একাংশ পুড়ে যায়।
প্রাথমিক তদন্তের বরাতে এনডিটিভি জানিয়েছে, হোটেলটিতে ন্যূনতম অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না। এই ঘটনায় কলকাতা পুলিশ একটি মামলা করেছে। হোটেলের মালিক ও কর্মীরা পলাতক রয়েছেন। পুলিশ তাদের খুঁজছে।
উদ্ধার অভিযানে গিয়ে ভবনটি থেকে প্রায় ৬০ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, হোটেলের তৃতীয় তলা থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। একটি এয়ার কন্ডিশনার (এসি) বিস্ফোরণের কারণে এই আগুন লেগে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
দমকলকর্মীরা হোটেলের ভেতর থেকে অজ্ঞান অবস্থায় ৯ জনকে উদ্ধার করে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। হাসপাতাল সূত্রে খবর, তাদের সকলকেই মৃত অবস্থায় আনা হয়েছিল। অগ্নিকাণ্ডের সময় আহত কয়েকজনকে কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। পুলিশ এলাকাটি ঘিরে রেখে ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। গুরুতর আহত ৬ জনের চিকিৎসা চলছে কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে।
দেবাশীষ দত্ত ছিলেন কুষ্টিয়ার গণমাধ্যম অঙ্গনের দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ। সদা হাস্যোজ্জ্বল, প্রাণবন্ত ও সহজ-সরল ব্যবহারের কারণে সহকর্মী ও পরিচিতজনদের কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রিয়।
পেশাগত জীবনে সহকর্মীদের সঙ্গে তাঁর আন্তরিক সম্পর্ক এবং মানুষের সঙ্গে সহজভাবে মিশে যাওয়ার স্বভাব তাঁকে সবার কাছে আপন করে তুলেছিল।
একই পরিবারের তিন সদস্যকে একসঙ্গে হারানোর ঘটনায় স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে নেমে এসেছে শোকের মাতম।
দেবাশীষ দত্তের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর কুষ্টিয়ার সাংবাদিক অঙ্গনে গভীর শোকের সৃষ্টি হয়েছে। সহকর্মীরা তাঁর সঙ্গে কাটানো বিভিন্ন স্মৃতির কথা স্মরণ করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করছেন সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। সহকর্মীরা বলেন, দেবাশীষ দত্ত ছিলেন একজন হাসিখুশি ও বন্ধুবৎসল মানুষ। কর্মক্ষেত্রে তাঁর আন্তরিকতা, সহকর্মীদের প্রতি সহযোগিতার মনোভাব এবং প্রাণবন্ত উপস্থিতি তাঁকে সবার কাছে আলাদা করে তুলেছিল। তাঁর এমন আকস্মিক ও মর্মান্তিক মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
একই ঘটনায় তাঁর স্ত্রী ও মেয়ের মৃত্যুর খবর শোককে আরও ভারী করে তুলেছে। একটি পরিবারের তিন সদস্যের এমন করুণ পরিণতিতে স্বজন, বন্ধু, সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে গভীর বেদনা বিরাজ করছে। দেবাশীষ দত্ত ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের মর্মান্তিক মৃত্যুতে কুষ্টিয়ার গণমাধ্যম অঙ্গনে শোকের আবহ বিরাজ করছে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তাঁদের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেছেন। পাশাপাশি শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে এই অপূরণীয় ক্ষতি সহ্য করার শক্তি কামনা করা হয়েছে।
দেবাশীষ দত্ত, তাঁর স্ত্রী ও মেয়ের এই অকাল ও মর্মান্তিক মৃত্যু কুষ্টিয়ার সাংবাদিক সমাজে যে শূন্যতা তৈরি করেছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। তাঁদের স্মৃতি সহকর্মী, স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের হৃদয়ে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবে।