বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২৯, ২০২৬
 শিরোনাম
মধ্যপ্রাচ্যে ২৭টি মার্কিন ঘাঁটিতে আইআরজিসির হামলা সুনামগঞ্জ-এর ছাতক থানা পুলিশের অভিযানে নিয়মিত মামলার ৩ আসামি গ্রেফতার শাহ আমানত বিমানবন্দরে মধ্যপ্রাচ্যের ১০ ফ্লাইট বাতিল এনসিপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ, দেশজুড়ে কর্মসূচি বঙ্গোপসাগরে জলদস্যু দমনে প্রযুক্তিনির্ভর কঠোর নজরদারি-টহল প্রতিমন্ত্রী হয়ে নিজ এলাকায় নুরুল হক ইয়াবা ব্যবসায়ীদের এলাকা ছাড়ার হুঁশিয়ারি: টেকনাফে এমপি শাহজাহান চৌধুরী নগরবাসীর নিরাপত্তায় মধ্যরাতে রাস্তায় আইজিপি: আকস্মিক পরিদর্শনে কড়া বার্তা পাকিস্তান সীমান্তে আফগানিস্তানের হামলা, কাবুল-কান্দাহারে পাল্টা হামলা ফোন করে জামায়াত আমিরের স্বাস্থ্যের খোঁজ নিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

তিন বছরেও চালু হয়নি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সেবাবঞ্চিত প্রায় দুই লাখ মানুষ

তিন বছরেও চালু হয়নি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সেবাবঞ্চিত প্রায় দুই লাখ মানুষ

তিন বছরেও চালু হয়নি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সেবাবঞ্চিত প্রায় দুই লাখ মানুষ

প্রতিনিধি, রাঙ্গাবালী (পটুয়াখালী)
আসাদুজ্জামান কাজল। 
পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার প্রায় দুই লাখ মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ও সুচিকিৎসার অভাব রয়েছে। এখানে কোনো সরকারি হাসপাতাল বা পর্যাপ্ত চিকিৎসকের ব্যবস্থা না থাকায় সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
ভুক্তভোগী জাফর দালাল জানান, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়লে রাঙ্গাবালীতে কোনো হাসপাতাল না থাকায় তাকে আগুনমুখা নদী পাড়ি দিয়ে গলাচিপা হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু পথিমধ্যে ট্রলারেই তার স্ত্রী মারা যান। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “আমাদের দাবি, দ্রুত রাঙ্গাবালী হাসপাতাল হোক, যাতে এখানকার মানুষ চিকিৎসাসেবা পায় এবং চিকিৎসার অভাবে অকালে প্রাণ হারাতে না হয়।”
ঠান্ডা ও জ্বরে আক্রান্ত তিন মাসের শিশুকে নিয়ে পটুয়াখালী হাসপাতালে গিয়েছিলেন বেল্লাল গাজী ও সুমাইয়া আক্তার দম্পতি। অসুস্থ সন্তান নিয়ে পরদিন দুপুরেই তাদের বাড়ি ফিরতে হয়। যাতায়াতে তাদের দুবার উত্তাল আগুনমুখা নদী পাড়ি দিতে হয়েছে। কোড়ালিয়া লঞ্চঘাটে তারা জানান, হাসপাতালে চিকিৎসকের দেখা পেতে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় এবং রোগীর চাপ বেশি থাকায় বাধ্য হয়ে ফিরে আসেন। এখন বাড়িতেই সন্তানকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাদের।
নদীপথের এই ভোগান্তি সয়ে অনেকে হাসপাতালে গেলেও ছোটবাইশদিয়া ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামের রাসেল মাহমুদ তা পারেননি। ঠান্ডা, জ্বর ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত পাঁচ মাসের সন্তানকে তিনি রাঙ্গাবালী ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যান। কিন্তু সেখানে কোনো চিকিৎসক না থাকায় প্রাথমিক চিকিৎসা ও পরামর্শের ওপরই তাকে ভরসা করতে হয়।
রাসেল বলেন, “পুরো উপজেলায় কোনো সরকারি হাসপাতাল নেই। ইউনিয়নে স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকলেও চিকিৎসক নেই। ফলে ন্যূনতম চিকিৎসাসেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন বাসিন্দারা।”
স্থানীয়রা জানান, রাঙ্গাবালীতে তিন বছর আগে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নির্মাণকাজ শুরু হলেও তা এখনো শেষ হয়নি। ফলে অসুস্থ হলে নদী পাড়ি দিয়ে পার্শ্ববর্তী উপজেলা বা জেলা সদরে যেতে হয়। উপজেলা ঘোষণার ১৪ বছর পরও কাটেনি এই চিকিৎসা সংকট।
চারপাশে বুড়া গৌরাঙ্গ, তেঁতুলিয়া ও আগুনমুখা নদী এবং একপাশে বঙ্গোপসাগর ঘেরা রাঙ্গাবালী জেলা সদর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন একটি উপজেলা। ৬টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই উপজেলার চারটি ইউনিয়নই সদর থেকে বিচ্ছিন্ন এবং দুর্গম চরাঞ্চলের। প্রায় দুই লাখ মানুষ এখানে বসবাস করেন।
প্রশাসনিক তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি রাঙ্গাবালীকে উপজেলা ঘোষণা করা হয়। এর এক দশক পর ২০২৩ সালের জুলাইয়ে সেখানে ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণের কাজ শুরু হয়।
স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে পাঁচ একর জমির ওপর ৫০ শয্যার এই হাসপাতাল নির্মাণের দরপত্র প্রকাশ করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালের ১০ এপ্রিল প্রথম লটের কাজের কার্যাদেশ দেওয়া হয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আবুল কালাম আজাদ-প্রাইম কনস্ট্রাকশনকে (একেএ-পিসি)। এতে ব্যয় ধরা হয় ১২ কোটি ৬৭ লাখ ২৮ হাজার টাকা। তবে পর্যাপ্ত বরাদ্দের অভাবে নির্মাণকাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে রাঙ্গাবালীর স্বাস্থ্য কার্যক্রম পার্শ্ববর্তী গলাচিপা উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় থেকেই মূলত পরিচালিত হচ্ছে।
পদ থাকলেও চিকিৎসকশূন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্র
গলাচিপা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, রাঙ্গাবালীর ছয়টি ইউনিয়নের মধ্যে একমাত্র চালিতাবুনিয়ায় একটি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র রয়েছে। এছাড়া রাঙ্গাবালী, ছোটবাইশদিয়া, বড়বাইশদিয়া ও চরমোন্তাজ ইউনিয়নে একটি করে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে। তবে মৌডুবি ইউনিয়নে কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই।
উপজেলা সদর থেকে বিচ্ছিন্ন চালিতাবুনিয়া উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে পাঁচটি পদ থাকলেও সেখানে শুধু একজন সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল কর্মকর্তা ও একজন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা কর্মরত আছেন। চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট ও অফিস সহায়কের পদগুলো শূন্য। ভবনটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় প্রায় এক বছর আগে এটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। বর্তমানে চালিতাবুনিয়ার কর্মীরা পার্শ্ববর্তী অন্যের বাড়ির আঙিনায় সেবা দিচ্ছেন।
অন্যদিকে চারটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মেডিকেল কর্মকর্তার চারটি পদই শূন্য। চরমোন্তাজ ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে লোকবল পদায়ন করা হলেও তারা যোগ না দেওয়ায় এর কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
গলাচিপা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মেজবাহউদ্দিন জানান, বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপবাসীর কাছে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য তারা সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
নৌপথের ঝুঁকি ও ওষুধের সংকট
রাঙ্গাবালী থেকে জেলা সদর ও আশপাশের উপজেলায় যাতায়াতের প্রধান ভরসা ট্রলার ও লঞ্চ। সন্ধ্যার পর নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে সংকটাপন্ন রোগীকে অন্য উপজেলায় নেওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়। তখন বাধ্য হয়ে ইঞ্জিনচালিত ছোট নৌকা বা স্পিডবোটে করে উত্তাল নদী পাড়ি দিয়ে গলাচিপা বা কলাপাড়ায় নিতে হয়, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
এছাড়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সরবরাহ নেই। সামান্য জ্বর বা ডায়রিয়ার মতো রোগের জন্য স্থানীয়দের ফার্মেসির বিক্রেতা কিংবা ঝাড়ফুঁকের ওপর ভরসা করতে হয়। কোড়ালিয়া গ্রামের টুম্পা রানী জানান, জরুরি চিকিৎসার অভাবে পথেই প্রসূতি মা ও গর্ভের সন্তানের মৃত্যুর ঘটনা এখানে নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পটুয়াখালী পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. শহিদুল ইসলাম জানান, চিকিৎসক ও লোকবল সংকটের পাশাপাশি কেন্দ্র বন্ধ থাকা এবং পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ না থাকার বিষয়টি তারা জানেন। সংকট নিরসনের চেষ্টা চলছে।
সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, নানা জটিলতার কারণে ২০২৪ সালে রাঙ্গাবালী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়। তবে বাকি কাজ দুটি লটে ভাগ করে ২০২৭ সালের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে লট-১-এর আওতাধীন মূল হাসপাতাল ভবনের নতুন ঠিকাদার নিয়োগের দরপ্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
পটুয়াখালীর সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ খালেদুর রহমান মিয়া বলেন, “কমিউনিটি ক্লিনিক ছাড়া রাঙ্গাবালীতে কার্যকর কোনো স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স গড়ে ওঠেনি, যা দুই লাখ মানুষের জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক। তবে আশার কথা হলো, বন্ধ থাকা কাজ শিগগিরই শুরু হতে যাচ্ছে। আশা করা যায়, এক মাসের মধ্যে লট-১-এর মূল ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হবে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ হবে।”
ছবির ক্যাপশন:
পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলায় তিন বছরেও চালু হয়নি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।