সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার তামাই গ্রামে ডাইং মিলের বর্জ্য ও দূষিত পানি নিষ্কাশনের কারণে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, তামাই লাল মসজিদ সংলগ্ন পান্নু মুন্সীর ডাইং মিল থেকে নির্গত বর্জ্য ও দূষিত পানি নিষ্কাশনের সুষ্ঠু ব্যবস্থা না থাকায় তা আশপাশের রাস্তা, নিচু এলাকা এবং সরকারি ইজারাকৃত পুকুর ও সরকারি রাস্তায় প্রবাহিত হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, অন্যদিকে জনসাধারণের চলাচল ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে এবং বিভিন্ন রোগ ব্যাধি প্রকোপ আকার ধারণ করছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ডাইং মিলের পানি পরিশোধন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার যথাযথ ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিনিয়ত দূষিত পানি রাস্তায় ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে রাস্তায় জমে থাকা পানিতে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। ওই রাস্তা দিয়েই ডাইং মিল থেকে প্রবাহিত বিষাক্ত কেমিক্যাল মিশ্রিত পানির মধ্য দিয়েই প্রতিদিন শিক্ষার্থী, পথচারী ও মসজিদের মুসুল্লী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের চলাচল করতে হচ্ছে।
এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে সরকারি ইজারাকৃত একটি পুকুর।পুকুরের ইজারাদার মঈন বলেন,“তামাই গ্রামের এই পুকুরটি একটি ঐতিহ্যবাহী পুকুর। দীর্ঘ দিন ধরে এই পুকুরে কচুরীপানা দিয়ে ভর্তি ছিল, সরকার থেকে ইজারা নেয়ার পর প্রায় লক্ষাধিক টাকা খরচ করে এই পুকুর সংস্কার করা হয় মাছ চাষের উদ্দেশ্যে । ডাইং এর মালিক পান্নু মুন্সীকে বার বার মানা করা সত্ত্বেও তিনি প্রায় দীর্ঘ দিন ধরে কাউকে না জানিয়ে ডাইং এর পাশের লাল মসজিদ এর পানির লাইনে চুরি করে তার ডাইং এর লাইন সংযুক্ত করে বিষাক্ত কেমিক্যালের পানি আমার পুকুরে প্রবাহিত করছে, ডাইং মিলের বিষাক্ত পানির কারণে পুকুরটি চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এখানে মাছ চাষ করা সম্ভব হচ্ছে না।”এছাড়াও তিনি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ভাবে বিশেষ করে বৃষ্টির সময় তার ডাইং এর পানি ছেড়ে দেয় সরকারি রাস্তায় ও অন্যের বসতবাড়ীর দিকে। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে তিনি এইসব অন্যায় কাজ করে আসছেন।
স্থানীয় ভুক্তভোগী ফিরোজ খান অভিযোগ করে বলেন, ডাইং মিলের পানি বিভিন্ন সময় রাস্তা ও বসতবাড়ির দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর প্রতিবাদ করতে গিয়ে কয়েকবার মারধরের শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, তামাই বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, সানফ্লাওয়ার একাডেমি তামাই, প্রত্যাশা কোচিং সেন্টার ও প্রভাকর বিদ্যানিকেতনের শিক্ষার্থীরা নিয়মিত এই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করে। এছাড়া তামাই বাজারের ক্রেতা-বিক্রেতারাও এ পথ ব্যবহার করেন। কিন্তু ডাইং মিলের দূষিত পানি রাস্তায় প্রবাহিত হওয়ায় তাদের প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ডাইং মিলের বর্জ্য ও দূষিত পানি শুধু রাস্তা ও পুকুরেই সীমাবদ্ধ নেই; আশপাশের পরিবেশেও এর প্রভাব পড়ছে। ডাইং মিল থেকে নির্গত ধোঁয়া ও বর্জ্যের কারণে পরিবেশের পাশাপাশি স্থানীয়দের স্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এলাকাবাসীর কয়েকজনের দাবি, আশপাশের কিছু টিউবওয়েলের পানিতে দুর্গন্ধ দেখা দিয়েছে এবং কোথাও কোথাও পানি ব্যবহারে সমস্যা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দূষিত পানি ব্যবহারের কারণে কারও কারও চর্মরোগ, ডায়রিয়া ও অন্যান্য শারীরিক সমস্যাও দেখা দিচ্ছে। শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে তারা বেশি উদ্বিগ্ন।
তবে এসব স্বাস্থ্য সমস্যার সঙ্গে ডাইং মিলের দূষিত পানি বা ধোঁয়ার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত নয়। স্থানীয়দের অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে টিউবওয়েলের পানি, পুকুরের পানি ও ডাইং মিলের বর্জ্যের নমুনা পরীক্ষা এবং স্বাস্থ্য বিভাগের প্রয়োজনীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
বিশেষ করে দীর্ঘদিন দূষিত পানি ও বর্জ্যের সংস্পর্শে থাকলে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর কোনো বিরূপ প্রভাব পড়ছে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখার দাবি উঠেছে। স্থানীয়রা বলছেন, বিষয়টি অবহেলা করা হলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি হতে পারে।
এ বিষয়ে বেলকুচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আফরিন জাহান বলেন, “পান্নু ডাইং মিল সম্পর্কে আমরা কোনো অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে এলাকাবাসীর দাবি, শুধু অভিযোগ পাওয়ার অপেক্ষায় না থেকে বিষয়টি সরেজমিনে পরিদর্শন করে ডাইং মিলটির পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পরিবেশ অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দূষণের মাত্রা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয়দের আরও দাবি, সরকারি রাস্তা ও ইজারাকৃত পুকুরে দূষিত পানি প্রবেশ বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি পুকুর ও আশপাশের পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবেশ পুনরুদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
তাদের অভিযোগ, ডাইং মিলের পানি নিষ্কাশনের সুষ্ঠু ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পানি রাস্তায় চলে আসছে। এতে দুর্গন্ধ, জলাবদ্ধতা ও পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের চলাচলে চরম ভোগান্তি সৃষ্টি হচ্ছে।
এলাকাবাসী দ্রুত উপজেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বিত তদন্ত দাবি করেছেন। একই সঙ্গে দূষিত পানি ও বর্জ্যের কারণে পরিবেশ কিংবা জনস্বাস্থ্যের কোনো ক্ষতি হয়ে থাকলে তা নিরূপণ করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
তবে স্থানীয়দের এসব অভিযোগের বিষয়ে ডাইং মিলের মালিক পান্নু মুন্সীর বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
আল-আমিন হোসেন
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি
