বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের জগতে যে কজন নারী শিল্পী নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছেন, শারমিন সুলতানা সুমি তাঁদের অন্যতম। শ্রোতাদের কাছে তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিত ‘সুমি’ নামে। তিনি একাধারে কণ্ঠশিল্পী, গীতিকার, সুরকার ও প্লেব্যাক গায়িকা এবং জনপ্রিয় ব্যান্ড চিরকুট-এর প্রতিষ্ঠাতা, প্রধান কণ্ঠশিল্পী ও অন্যতম প্রধান সৃজনশীল শক্তি।
শৈশব ও বেড়ে ওঠা
সুমির জন্ম ১৬ সেপ্টেম্বর, খুলনায়। দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার নদী, প্রকৃতি ও সাংস্কৃতিক আবহে তাঁর শৈশব কেটেছে। তিনি বেড়ে উঠেছেন একটি সংগীতপ্রেমী পরিবারে। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ তৈরি হয়। তাঁর বাবা মকবুল হোসেন খুলনার খালিশপুরের দৌলতপুর জুট মিলে কর্মরত ছিলেন এবং মা ছিলেন গৃহিণী।
শৈশবের সংগীতচর্চার স্মৃতি সুমির জীবনে বিশেষ জায়গা দখল করে আছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পরিবারের সংগীতময় পরিবেশই তাঁকে গান ও সৃষ্টিশীলতার পথে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও নতুন স্বপ্ন
খুলনা থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় এসে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে। সেখানেই শুরু হয় তাঁর জীবনের এক নতুন অধ্যায়।
২০০২ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে তিনি গড়ে তোলেন ‘চিরকুট’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির একটি কক্ষে নিয়মিত সংগীতচর্চার মধ্য দিয়ে ব্যান্ডটির পথচলা শুরু হয়েছিল। এমনকি ‘চিরকুট’ নামটিও সুমির দেওয়া।
পরবর্তীতে সুমি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। সংগীতের পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন পেশাতেও কাজ করেছেন—বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কপিরাইটার, মানবসম্পদ ও পণ্য ব্যবস্থাপনা এবং বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনে ক্রিয়েটিভ কনসালট্যান্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
চিরকুট—একটি স্বপ্নের নাম
২০০২ সালে যাত্রা শুরু করা চিরকুট ধীরে ধীরে বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় ফিউশন/ফোক-রক ব্যান্ডে পরিণত হয়। ব্যান্ডটির গানের কথা ও সুর সৃষ্টিতে সুমির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাঁর লেখা ও সুরে উঠে এসেছে প্রেম, জীবন, প্রতিবাদ, নগরজীবন, মানুষের স্বপ্ন এবং বাংলার মাটি ও মানুষের গল্প।
চিরকুটের উল্লেখযোগ্য অ্যালবাম— চিরকুটনামা — ২০১০ জাদুর শহর — ২০১৩ উদাও — ২০১৭
পরবর্তীতে ব্যান্ডটি লোকসংগীতের ঐতিহ্য ও সমকালীন জীবনের অভিজ্ঞতাকে মিলিয়ে নতুন ধরনের ‘আরবান ফোক’ বা আধুনিক লোকধারার গান নিয়েও কাজ করেছে।
প্লেব্যাক ও চলচ্চিত্রের গান
চিরকুটের গান ছাড়াও সুমি চলচ্চিত্রের জন্য প্লেব্যাক করেছেন। *‘আয়নাবাজি’সহ বিভিন্ন চলচ্চিত্রে তাঁর কণ্ঠ শ্রোতাদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। তাঁর কণ্ঠে ও সৃষ্টিতে *‘আহারে জীবন’, ‘জাদুর শহর’, ‘কানামাছি’**সহ বেশ কিছু গান জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
তিনি অন্য শিল্পীদের জন্যও গান লিখেছেন ও সুর করেছেন। তাঁর লেখা ‘ধীরে ধীরে’ গানটি হাবিব ওয়াহিদ ও ন্যান্সির কণ্ঠে জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে
চিরকুটের আন্তর্জাতিক যাত্রাও বেশ সমৃদ্ধ। ২০১২ সালে India Music Week, এরপর শ্রীলঙ্কার Jaffna Music Festival এবং নরওয়েসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আয়োজনে তারা বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছে। ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অস্টিনে South by Southwest (SXSW)-এও চিরকুট অংশ নেয়।
২০২১ সালে সুমি অর্জন করেন আরও একটি উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। পর্তুগালের পোর্তোতে অনুষ্ঠিত WOMEX 21 (Worldwide Music Expo)-এ অংশ নেওয়ার জন্য তিনি আমন্ত্রিত হন এবং সেখানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁকে WOMEX-এ অংশ নেওয়া প্রথম বাংলাদেশি সংগীতশিল্পী হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
২০২২ সালে চিরকুট নিউইয়র্কের Madison Square Garden-এ অনুষ্ঠিত ‘Golden Jubilee Bangladesh Concert’-এ বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে—যেখানে কিংবদন্তি জার্মান ব্যান্ড Scorpions ছিল অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ।
একজন শিল্পীর চেয়ে আরও বেশি কিছু
সুমি শুধু একজন গায়িকা নন; তিনি একজন গল্পকথক, গীতিকার ও সুরস্রষ্টা। তাঁর গানে যেমন রয়েছে মাটির গন্ধ, তেমনি রয়েছে শহুরে জীবনের অস্থিরতা, মানুষের অনুভূতি এবং সময়ের কথা।
নারী শিল্পী হিসেবে সংগীতের জগতে নিজের জায়গা তৈরি করতে তাঁকে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু প্রতিকূলতাকে বাধা হিসেবে না দেখে তিনি সেটাকেই নিজের শক্তি ও সৃষ্টিশীলতার অনুপ্রেরণায় পরিণত করেছেন।
প্রায় দুই দশকের বেশি সময় ধরে সুমির কণ্ঠ ও সৃষ্টিশীলতা বাংলাদেশের আধুনিক ব্যান্ডসংগীতকে সমৃদ্ধ করে চলেছে। তাঁর হাত ধরে চিরকুট যেমন পেয়েছে নিজস্ব একটি সংগীতভাষা, তেমনি বাংলাদেশের গানও পৌঁছেছে আন্তর্জাতিক শ্রোতাদের কাছে।
আজ ১৬ সেপ্টেম্বর, এই গুণী শিল্পীর জন্মদিন।
শুভ জন্মদিন শারমিন সুলতানা সুমি।
আপনার কণ্ঠে, কথায় ও সুরে বাংলা গান আরও সমৃদ্ধ হোক। নতুন নতুন সৃষ্টিতে আলোকিত হোক বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গন।
শুভ জন্মদিন, সুমি।
শুভ হোক আপনার সুরের পথচলা।
বিনোদন প্রতিবেদক
মোহিত লাল সাহা