বুধবার, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২৬
 শিরোনাম
মধ্যপ্রাচ্যে ২৭টি মার্কিন ঘাঁটিতে আইআরজিসির হামলা সুনামগঞ্জ-এর ছাতক থানা পুলিশের অভিযানে নিয়মিত মামলার ৩ আসামি গ্রেফতার শাহ আমানত বিমানবন্দরে মধ্যপ্রাচ্যের ১০ ফ্লাইট বাতিল এনসিপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ, দেশজুড়ে কর্মসূচি বঙ্গোপসাগরে জলদস্যু দমনে প্রযুক্তিনির্ভর কঠোর নজরদারি-টহল প্রতিমন্ত্রী হয়ে নিজ এলাকায় নুরুল হক ইয়াবা ব্যবসায়ীদের এলাকা ছাড়ার হুঁশিয়ারি: টেকনাফে এমপি শাহজাহান চৌধুরী নগরবাসীর নিরাপত্তায় মধ্যরাতে রাস্তায় আইজিপি: আকস্মিক পরিদর্শনে কড়া বার্তা পাকিস্তান সীমান্তে আফগানিস্তানের হামলা, কাবুল-কান্দাহারে পাল্টা হামলা ফোন করে জামায়াত আমিরের স্বাস্থ্যের খোঁজ নিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

আজ প্রতিভাবান অভিনেতা সুনীল মুখোপাধ্যায়ের জন্মদিন

আজ প্রতিভাবান অভিনেতা সুনীল মুখোপাধ্যায়ের জন্মদিন

আজ প্রতিভাবান অভিনেতা সুনীল মুখোপাধ্যায়ের জন্মদিন

সুনীল মুখোপাধ্যায় ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্র, মঞ্চ ও টেলিভিশনের একজন অত্যন্ত প্রতিভাবান এবং সমাদৃত অভিনেতা। পর্দায় মূলত প্রান্তিক মানুষ—চোর, মাতাল, চাকর কিংবা নিঃস্ব মানুষের চরিত্রকে জীবন্ত ও স্বতঃসিদ্ধ করে তুলতে তাঁর জুড়ি মেলা ভার ছিল। অল্প সময়ের উপস্থিতিতেও তিনি নিজের অসাধারণ অভিনয়গুণে দর্শকের মনে স্থায়ী ছাপ রেখে যেতেন।


সুনীল মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৪৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর অবিভক্ত বাংলার বর্তমান বাংলাদেশের ফরিদপুরে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর শৈশবেই তিনি পরিবারের সঙ্গে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে কলকাতায় চলে আসেন। শরণার্থী হিসেবে কলকাতায় শুরু হয় তাঁদের নতুন জীবনের সংগ্রাম।
উত্তর কলকাতার সাধারণ মধ্যবিত্ত ও সাংস্কৃতিক পরিবেশে তাঁর বেড়ে ওঠা। সেই সময়ের পাড়ার নাটক এবং উত্তর কলকাতার সমৃদ্ধ নাট্যচর্চার পরিবেশই তাঁর মধ্যে অভিনয়ের প্রতি গভীর আকর্ষণ সৃষ্টি করে। কলকাতার মণীন্দ্রচন্দ্র কলেজ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করার পর কলেজজীবন থেকেই তিনি নাটকের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত হয়ে পড়েন।

 

অভিনয়ের জগতে তাঁর হাতেখড়ি মূলত থিয়েটারের মাধ্যমে। তিনি প্রথমে কিংবদন্তি অভিনেতা ও নাট্যব্যক্তিত্ব উৎপল দত্তের নাট্যদলের সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তীকালে দীর্ঘদিন ক্যালকাটা পিপলস আর্ট থিয়েটার-এর সঙ্গেও কাজ করেন এবং অসংখ্য নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন।


অভিনয়জীবনের শুরু
১৯৭১ সালে মৃণাল সেনের ‘কলকাতা ৭১’ ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পেলেও সম্পাদনার সময় তাঁর অংশ বাদ পড়ে যায়। পরে পরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ‘নিম অন্নপূর্ণা’ ছবিতে মুখ্য ভূমিকায় অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন।


এরপর ধীরে ধীরে বাংলা চলচ্চিত্রে একজন নির্ভরযোগ্য ও শক্তিশালী চরিত্রাভিনেতা হিসেবে নিজের স্বতন্ত্র জায়গা তৈরি করেন সুনীল মুখোপাধ্যায়।


অভিনয়ের স্বতন্ত্র ধারা
সুনীল মুখোপাধ্যায়কে সচরাচর দেখা যেত সমাজের প্রান্তিক ও অবহেলিত মানুষের চরিত্রে। চাকর, মাতাল, চোর কিংবা নিঃস্ব মানুষের ভূমিকায় তাঁর অভিনয় ছিল এতটাই স্বাভাবিক ও জীবন্ত যে, পর্দায় তাঁকে অভিনয় করতে দেখা নয়—বরং সেই চরিত্রগুলোর বাস্তব অস্তিত্বই যেন অনুভব করা যেত।


ঋতুপর্ণ ঘোষের প্রথম চলচ্চিত্র ‘হীরের আংটি’-তে চোরের চরিত্রে তাঁর অভিনয় বিশেষভাবে দর্শকের নজর কাড়ে। নব্বইয়ের দশকে জনপ্রিয় টেলিসিরিয়াল ‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’-তে গোয়েন্দা বরদাচরণ চরিত্রেও তিনি অভিনয় করেছিলেন।


উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে তিনি অসংখ্য উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। তাঁর অভিনীত ছবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
‘অমৃত কুম্ভের সন্ধানে’, ‘খারিজ’, ‘পার’, ‘আবার অরণ্যে’, ‘কালবেলা’, ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস আইয়ার’, ‘পদ্মানদীর মাঝি’, ‘তাহাদের কথা’, ‘বোস: দ্য ফরগটেন হিরো’, ‘গৃহযুদ্ধ’, ‘ফেরা’ প্রভৃতি।
এ ছাড়া ‘দেবশিশু’, ‘ঋণমুক্তি’, ‘এক পল’, ‘দখল’, ‘পাতাল ঘর’-সহ আরও বহু চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকদের কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে।
‘ফেরা’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য তিনি সেরা সহ-অভিনেতার পুরস্কার লাভ করেন।

 

জীবনের শেষ অধ্যায়
সিনেমার পর্দায় যিনি এত নিপুণভাবে প্রান্তিক ও নিঃস্ব মানুষের জীবনের ছবি ফুটিয়ে তুলেছিলেন, বাস্তব জীবনেও সেই শিল্পীকে জীবনের শেষভাগে চরম অবহেলা ও দুর্দশার মুখোমুখি হতে হয়েছিল।
জীবনের শেষ দিকে তিনি তীব্র আর্থিক অনটনের মধ্যে দিন কাটান এবং ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হন। ২০১২ সালের মে মাসে কলকাতায় চরম দারিদ্র্য ও অসহায়তার মধ্যে এই অসাধারণ শিল্পীর জীবনাবসান ঘটে।


বাংলা চলচ্চিত্র ও নাটকের প্রতি তাঁর অবদান নিঃসন্দেহে স্মরণীয়। একজন অভিনেতা হিসেবে তিনি হয়তো সবসময় প্রধান চরিত্রের আলোয় ছিলেন না, কিন্তু ছোট ছোট চরিত্রকেও নিজের অসামান্য অভিনয়শক্তিতে তিনি করে তুলতেন স্মরণীয় ও প্রাণবন্ত।


প্রতিভাবান এই অভিনেতা সারা জীবন বাংলা চলচ্চিত্র ও নাট্যজগৎকে অনেক কিছু দিয়েছেন। অথচ জীবনের শেষ প্রান্তে তিনি পাননি তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা ও স্বীকৃতি। হয়তো সময়ের সঙ্গে অনেক প্রতিভাবান শিল্পীর নাম হারিয়ে যায়, কিন্তু থেকে যায় তাঁদের সৃষ্টি—পর্দায় ফুটিয়ে তোলা সেইসব অমর চরিত্র।


আজ তাঁর জন্মদিনে বাংলা চলচ্চিত্র ও নাট্যজগতের এই অসাধারণ চরিত্রাভিনেতাকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।


বিনোদন প্রতিবেদক
মোহিত লাল সাহা