পিরোজপুরের কাউখালী সরকারি মহাবিদ্যালয়ে ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের একাদশ শ্রেণির ভর্তি নির্দেশিকায় (প্রসপেক্টাস) শেখ মুজিবুর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশংসামূলক বক্তব্য এবং শপথবাক্য অন্তর্ভুক্ত করার ঘটনায় চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। এর প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা প্রসপেক্টাসে আগুন দিয়ে বিক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষসহ তিন শিক্ষককে কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখেন। পরে প্রশাসন ও স্থানীয় বিএনপি নেতাদের হস্তক্ষেপে তাঁদের উদ্ধার করে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
ঘটনাটি তদন্তে পিরোজপুর জেলা প্রশাসন তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করেছে।
স্থানীয় ও কলেজ সূত্রে জানা যায়, ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের একাদশ শ্রেণির নবীন শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করা ভর্তি নির্দেশিকার চতুর্থ পৃষ্ঠায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘গণতন্ত্রের মানসকন্যা’ উল্লেখ করে তাঁর আমলে কলেজটি সরকারিকরণ হয়েছে বলে বর্ণনা করা হয়। এ ছাড়া বইটির শপথবাক্য অংশে ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে উন্নত, সমৃদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলবো’ মর্মে উল্লেখ করা হয়।
বিষয়টি সামনে আসায় সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বিকেলে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ শুরু করেন। একপর্যায়ে শত শত শিক্ষার্থী এবং উপজেলা ও কলেজ ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল বের করে কলেজের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন। শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের বাইরে বিতর্কিত নির্দেশিকা জড়ো করে আগুন ধরিয়ে দেন এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের শাস্তির দাবিতে স্লোগান দেন।
উত্তেজনা চলাকালে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. নজরুল ইসলাম, প্রকাশনা দায়িত্বে থাকা ইংরেজি বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক মোহা. মনিরুল ইসলাম ও প্রভাষক রিপন কুমার দাস নিজ কক্ষে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন।
সংবাদ পেয়ে পিরোজপুর জেলা প্রশাসকের নির্দেশে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মোহা. জহিরুল ইসলাম এবং কাউখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেহানা আক্তার সন্ধ্যায় কলেজে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি পর্যালোচনার উদ্যোগ নেন। পরবর্তীতে স্থানীয় জ্যেষ্ঠ বিএনপি নেতৃবৃন্দের মধ্যস্থতায় এবং প্রশাসনের আশ্বাসে রাত সাড়ে ৯টার দিকে অবরুদ্ধ তিন শিক্ষককে উদ্ধার করে পুলিশ হেফাজতে সোপর্দ করা হয়।
উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আল মাহমুদ সুমন অভিযোগ করে বলেন, "ঘটনার সঙ্গে জড়িতরা ফ্যাসিবাদের দোসর এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মাঝে এই বিতর্কিত বিষয় ছড়িয়ে দিয়েছে। আমরা অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।"
কাউখালী উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব ও কলেজের সাবেক ভিপি শাফিউল আজম দুলাল বলেন, "কলেজে ঘাপটি মেরে থাকা আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গীরা এই হীন কর্মকাণ্ড ঘটিয়েছে। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের কঠোর বিচার নিশ্চিত করতে হবে।"
মহাবিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. নজরুল ইসলাম বলেন, "প্রকাশনার বিষয়ে আমি বিস্তারিত অবগত নই। প্রসপেক্টাস প্রণয়নের জন্য একটি কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছিল, যাবতীয় কাজ সেই কমিটিই সম্পন্ন করেছে।"
পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক আবু সাঈদ জানান, ঘটনার কারণ ও দায় নির্ধারণে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মোহা. জহিরুল ইসলামকে আহ্বায়ক, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং কাউখালীর ইউএনও রেহানা আক্তারকে সদস্য করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটিকে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লিখিত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর দায়িত্বে অবহেলা বা ইচ্ছাকৃত বিভ্রান্তি সৃষ্টির প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বর্তমানে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে কলেজ ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ও নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।
পিরোজপুর প্রতিনিধি
