ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নাম অমিতাভ বচ্চন। দীর্ঘ অভিনয়জীবন, অসাধারণ কণ্ঠস্বর, ব্যক্তিত্বপূর্ণ উপস্থিতি ও বহুমাত্রিক অভিনয় দিয়ে কয়েক দশক ধরে দর্শকদের হৃদয়ে রাজত্ব করে আসছেন বলিউডের এই কিংবদন্তি অভিনেতা। আজ ১১ অক্টোবর, তাঁর ৮৪তম জন্মদিন। ১৯৪২ সালের এই দিনে ভারতের এলাহাবাদে (বর্তমান প্রয়াগরাজ) জন্মগ্রহণ করেন তিনি। এ বছর জীবনের ৮৪ বছরে পা রাখলেন এই বর্ষীয়ান তারকা।
অভিনয় দিয়ে জয় করেছেন কোটি দর্শকের হৃদয়
অমিতাভ বচ্চনের পুরো নাম অমিতাভ হরিবংশ বচ্চন। তাঁর বাবা হরিবংশ রাই বচ্চন ছিলেন হিন্দি সাহিত্যের প্রখ্যাত কবি এবং মা তেজি বচ্চন ছিলেন সংস্কৃতিমনা ব্যক্তিত্ব। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্য ও সংস্কৃতির আবহে বেড়ে ওঠা অমিতাভ পরবর্তী সময়ে নিজের অভিনয় প্রতিভা দিয়ে ভারতীয় চলচ্চিত্রে তৈরি করেন স্বতন্ত্র অবস্থান।
১৯৬৯ সালে ‘সাত হিন্দুস্তানি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় তাঁর। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলেও দমে যাননি তিনি। ১৯৭৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘জঞ্জির’ চলচ্চিত্র তাঁকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। এরপর ‘দিওয়ার’, ‘শোলে’, ‘ডন’, ‘ত্রিশূল’ ও ‘কালা পাত্থর’-এর মতো চলচ্চিত্রে অভিনয় করে হয়ে ওঠেন বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় তারকা।
সত্তর ও আশির দশকে তাঁর অভিনীত প্রতিবাদী, সাহসী ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো চরিত্রগুলো দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। এ সময়ই তিনি পরিচিতি পান ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’ হিসেবে। তাঁর গভীর কণ্ঠস্বর, সংলাপ বলার স্বতন্ত্র ধরন এবং পর্দায় শক্তিশালী উপস্থিতি তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে।
সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলে নেওয়ার গল্প
অমিতাভ বচ্চনের ক্যারিয়ার শুধু সাফল্যের গল্প নয়, ঘুরে দাঁড়ানোরও এক অনন্য উদাহরণ। ১৯৮২ সালে ‘কুলি’ চলচ্চিত্রের শুটিংয়ের সময় গুরুতর দুর্ঘটনার শিকার হন তিনি। তাঁর সুস্থতা কামনায় প্রার্থনা করেন অসংখ্য ভক্ত। সেই কঠিন সময় কাটিয়ে আবারও কাজে ফিরে আসেন এই অভিনেতা।
পরবর্তী সময়ে রাজনীতিতেও যুক্ত হয়েছিলেন তিনি। নব্বইয়ের দশকে ব্যবসায়িক উদ্যোগে আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হলেও ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ান। ২০০০ সালে টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’ উপস্থাপনার মাধ্যমে নতুন করে দর্শকদের কাছে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ছোট পর্দায় তাঁর সাবলীল উপস্থাপনা অনুষ্ঠানটিকে বিশেষ পরিচিতি এনে দেয়।
পরবর্তী সময়ে ‘বাগবান’, ‘ব্ল্যাক’, ‘পা’, ‘পিকু’ ও ‘পিঙ্ক’-এর মতো চলচ্চিত্রে ভিন্নধর্মী চরিত্রে অভিনয় করে প্রমাণ করেছেন, বয়স তাঁর প্রতিভার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।
প্রজন্মের পর প্রজন্মের অনুপ্রেরণা
অমিতাভ বচ্চনের অর্জনের ঝুলিতে রয়েছে অসংখ্য সম্মাননা। ভারতীয় চলচ্চিত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারসহ ভারতের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সম্মান পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ ও পদ্মবিভূষণ।
ব্যক্তিজীবনে অভিনেত্রী জয়া বচ্চনের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ দাম্পত্য জীবন। তাঁদের সন্তান শ্বেতা বচ্চন নন্দা ও অভিষেক বচ্চনও পরিচিত মুখ।
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে অমিতাভ বচ্চন বারবার নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন। কখনো অ্যাকশন হিরো, কখনো আবেগপ্রবণ বাবা, কখনো দৃঢ়চেতা বিচারক কিংবা সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার এক চরিত্রে তিনি দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন।
আজ তাঁর জন্মদিনে ভক্ত, সহকর্মী ও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের শুভেচ্ছা আর ভালোবাসায় উদ্যাপিত হচ্ছে বলিউডের এই মহাতারকার বিশেষ দিন। তাঁর জীবন ও কর্ম নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে দীর্ঘদিন।
শুভ জন্মদিন, অমিতাভ বচ্চন। ভারতীয় চলচ্চিত্রে আপনার অবদান সময়ের সীমানা পেরিয়ে বেঁচে থাকুক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
বিনোদন প্রতিবেদক
মোহিত লাল সাহা