বাংলার যাত্রাশিল্পে “চারণসম্রাট” মুকুন্দদাসের পর যে নামটি শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়, তিনি অমলেন্দু বিশ্বাস — যাত্রাশিল্পের “মানসপুত্র”, “যাত্রা সম্রাট”, এক উজ্জ্বল নক্ষত্র যিনি যাত্রাকে নিয়ে গিয়েছিলেন শিল্পের এক অভূতপূর্ব উচ্চতায়।
‘মাইকেল মধুসূদন’, ‘লেনিন’, ‘হিটলার’, ‘সিরাজউদ্দৌলা’, ‘অচল পয়সা’, ‘সন্ন্যাসী’, ‘সম্রাট জাহাঙ্গীর’, ‘জানোয়ার’— এমন অসংখ্য ব্যতিক্রমধর্মী যাত্রাপালায় তাঁর অনবদ্য অভিনয় ও পরিচালনা যাত্রাকে দিয়েছে নব মাত্রা, নব দিগন্ত।
অমলেন্দু বিশ্বাসের পৈতৃক নিবাস ছিল চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার মসজিদিয়া গ্রামে। তবে জন্মগ্রহণ করেন বার্মার (বর্তমান মায়ানমার)
ইয়াঙ্গুনে ১৯২৫ সালের ২৯ মে, পিতা সুরেন্দ্রলাল বিশ্বাস ও মাতা জ্ঞানদা দেবীর ঘরে। শৈশবে বাবার সঙ্গে ফিরে আসেন চট্টগ্রামে। ১৯৪১ সালে প্রবেশিকা পাস করে যোগ দেন ভারতীয় বিমানবাহিনীতে, পরে কিছুদিন পুলিশের চাকরিতেও ছিলেন। ১৯৪৪ সালে রবার্টসন কলেজ থেকে এফ.এ. পাশ করেন। দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন এবং রেলওয়ের হিসাব বিভাগে যোগ দেন।
আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশের হুলিয়া জারি হয়েছিল— কিন্তু তিনি ভয় পাননি। কারণ তাঁর প্রাণের আকাঙ্ক্ষা ছিল অন্যত্র— মঞ্চে, যাত্রার প্রাণে।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে তিনি শিল্পীকুশলীদের নিয়ে চলে যান পশ্চিমবঙ্গের রায়গঞ্জে। সেখানে মঞ্চস্থ করেন দেশাত্মবোধক একাধিক পালা, যেমন— ‘জয় বাংলা’, ‘আমি মুজিব বলছি’, ‘সাত কোটির মুজিব’, প্রভৃতি। এই পালাগুলোর মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পৌঁছে দেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনা।
যুদ্ধশেষে মুক্ত বাংলায় ফিরে এসে শুরু হয় তাঁর সৃষ্টিশীল জীবনের নতুন অধ্যায়। ১৯৭৩ সালে যশোরের সাগরদাঁড়ির মধুমেলায় বিধায়ক ভট্টাচার্য রচিত ‘বিদ্রোহী মাইকেল মধুসূদন’ যাত্রাপালা মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে অমলেন্দু বিশ্বাসের শিল্পজীবনে আসে ঐতিহাসিক মোড়। তিনি ছিলেন সেই পালার প্রাণপুরুষ— অভিনেতা, নির্দেশক ও স্রষ্টা।
৩৭ বছরের দীর্ঘ শিল্পযাত্রায় ১১ বছর তিনি নাটকে, ২৬ বছর যাত্রায় নিবেদিত ছিলেন। জীবনের শেষ অভিনয় ১৯৮৬ সালে ঢাকার বিডিআর ক্যান্টনমেন্টে ‘জানোয়ার’ পালায়— যেখানে তিনি আবারও প্রমাণ করেন, “মরা হাতি লাখ টাকা।”
১৯৮৭ সালের ১৩ অক্টোবর, ঢাকার শমরিতা নার্সিং হোমে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই মহান শিল্পী। নিভে যায় এক দীপ্ত আলোকবর্তিকা, যাত্রার এক যুগান্তকারী নায়ক।
অমলেন্দু বিশ্বাস জীবদ্দশায় পেয়েছিলেন অসংখ্য সম্মান—
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় যাত্রা উৎসবে পরপর দু’বার শ্রেষ্ঠ অভিনেতা,
সিকোয়েন্স অ্যাওয়ার্ড অব অনার,
থিয়েটার সম্মাননা (বেইলি রোড),
বাচসাস পুরস্কার।
মরণোত্তর প্রাপ্তি—
একুশে পদক (১৯৮৯)
মুনীর চৌধুরী সম্মাননা (১৯৯১)
তাঁর জীবনসঙ্গী জ্যোৎস্না বিশ্বাস নিজেও যাত্রার কিংবদন্তি শিল্পী। কন্যা অরুণা বিশ্বাস বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অভিনেত্রী, পুত্র মিঠু বিশ্বাস নাট্যপরিচালনায় নিজস্ব কৃতিত্ব রেখে চলেছেন।
আজ, তাঁর প্রয়াণ দিবসে গভীর শ্রদ্ধা জানাই সেই মহীরুহকে— যিনি যাত্রাকে জনশিল্প থেকে মহাশিল্পের মর্যাদা দিয়েছেন।
তিনি ছিলেন, আছেন, থাকবেন—
বাংলার মঞ্চ ইতিহাসের চিরস্মরণীয় “যাত্রা সম্রাট অমলেন্দু বিশ্বাস” হিসেবে।
বিনোদন প্রতিবেদক
মোহিত লাল সাহা