পরিচয়: ভারতীয় চলচ্চিত্র অভিনেত্রী
ভারতীয় হিন্দি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কিছু শিল্পী আছেন, যাঁদের পর্দায় উপস্থিতি মানেই আবেগ, মমতা, ত্যাগ আর বেদনার এক অনন্য প্রকাশ। নিরূপা রায় ছিলেন তেমনই একজন কিংবদন্তি অভিনেত্রী। পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের অভিনয়জীবনে আড়াই শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম স্মরণীয় অভিনেত্রী হিসেবে। বিশেষ করে মায়ের চরিত্রে তাঁর অসামান্য অভিনয় তাঁকে দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী আসন দিয়েছে।
জন্ম ও শৈশব
নিরূপা রায় ১৯৩১ সালের ৪ জানুয়ারি তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বোম্বে প্রেসিডেন্সির ভালসাদ অঞ্চলে, বর্তমান ভারতের গুজরাট রাজ্যে, জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মনাম ছিল কোকিলা কিশোরচন্দ্র বুলসারা। পরিবারের কাছে তিনি ‘ছিবি’ নামেও পরিচিত ছিলেন।
কৈশোরেই কমল রায়ের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয় এবং পরবর্তী সময়ে স্বামীর সঙ্গে মুম্বাইয়ে চলে আসেন। জীবনের এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই তাঁর সামনে খুলে যায় চলচ্চিত্রজগতের নতুন এক অধ্যায়। পর্দায় আত্মপ্রকাশের সময় চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক বিষ্ণুকুমার ব্যাস তাঁর নাম রাখেন ‘নিরূপা রায়’। এই নামেই পরবর্তী সময়ে তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রে অমর হয়ে ওঠেন।
চলচ্চিত্রজগতে যাত্রার সূচনা
১৯৪৬ সালে গুজরাটি চলচ্চিত্র ‘রানাকদেবী’ (Ranakdevi)-তে অভিনয়ের মাধ্যমে নিরূপা রায়ের চলচ্চিত্রজীবন শুরু হয়। প্রথমদিকে তিনি নায়িকা ও প্রধান চরিত্রে অভিনয় করতেন। তাঁর অভিনয়জীবনের শুরুটা ছিল মূলত গুজরাটি ও হিন্দি চলচ্চিত্রে পৌরাণিক এবং ঐতিহাসিক চরিত্রের মধ্য দিয়ে।
১৯৫০ সালের জনপ্রিয় পৌরাণিক চলচ্চিত্র ‘হর হর মহাদেব’ (Har Har Mahadev)-এ দেবী পার্বতীর চরিত্রে অভিনয় করে তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। পৌরাণিক চরিত্রে তাঁর ব্যক্তিত্ব, অভিব্যক্তি ও অভিনয়ের গভীরতা দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল। একসময় তাঁকে পৌরাণিক চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেত্রী হিসেবেও গণ্য করা হতো।
নায়িকা থেকে বলিউডের চিরকালীন মা
নিরূপা রায়ের অভিনয়জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায় শুরু হয় ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে। এ সময় তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রের বহু জনপ্রিয় নায়কের মায়ের চরিত্রে অভিনয় করে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে যান।
অমিতাভ বচ্চন, দেব আনন্দ, ধর্মেন্দ্র ও শশী কাপুরের মতো তারকাদের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। পর্দায় তাঁর মাতৃত্ব ছিল নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, সন্তানের জন্য আত্মত্যাগ, নৈতিক দৃঢ়তা এবং সীমাহীন অপেক্ষার প্রতীক।
দুঃখ, বেদনা ও মাতৃসুলভ চরিত্রের অসাধারণ রূপায়ণের জন্য হিন্দি চলচ্চিত্রজগতে তিনি ‘Queen of Misery’ নামে পরিচিতি পান। তবে এই অভিধার আড়ালে ছিল তাঁর অভিনয়ক্ষমতার এক অসাধারণ স্বীকৃতি—দর্শকের মনে গভীর আবেগ সৃষ্টি করার বিরল দক্ষতা।
‘দীওয়ার’: যে চরিত্র তাঁকে অমর করে রেখেছে
১৯৭৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘দীওয়ার’ (Deewaar) চলচ্চিত্রে অমিতাভ বচ্চন ও শশী কাপুরের সঙ্গে নিরূপা রায়ের অভিনয় ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে।
ছবিতে সুমিত্রা দেবী নামের মায়ের চরিত্রে তাঁর অভিনয় ছিল অসাধারণ আবেগপূর্ণ। দুই সন্তানের প্রতি ভালোবাসা, নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান এবং পারিবারিক দ্বন্দ্বের মধ্যে একজন মায়ের অসহায়তা—সবকিছুই তিনি অত্যন্ত জীবন্তভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন।
ছবিটির বিখ্যাত সংলাপ “মেরে পাস মা হ্যায়” আজও ভারতীয় জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে মায়ের ভালোবাসা ও মর্যাদার প্রতীক হিসেবে আলোচিত হয়।
‘দীওয়ার’-এর পাশাপাশি ‘অমর আকবর অ্যান্থনি’ (১৯৭৭), ‘মুকাদ্দর কা সিকন্দর’ (১৯৭৮), ‘মা’ (১৯৭৬), ‘মুনিমজি’ (১৯৫৫), ‘ছায়া’ (১৯৬১) এবং ‘শেহনাই’ (১৯৬৪) তাঁর অভিনয়জীবনের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে।
‘সুপারম্যান’ ও অভিনয়ের বৈচিত্র্য
নিরূপা রায় শুধু মাতৃত্বনির্ভর চরিত্রেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। ১৯৬০ সালের হিন্দি চলচ্চিত্র ‘সুপারম্যান’-এ অভিনয়ের জন্যও তিনি আলোচিত। পৌরাণিক চরিত্র থেকে সামাজিক ও পারিবারিক নাটক—বিভিন্ন ধরনের চলচ্চিত্রে কাজ করার মধ্য দিয়ে তিনি নিজের অভিনয়দক্ষতার বহুমাত্রিক পরিচয় দিয়েছিলেন।
পুরস্কার ও সম্মাননা
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে নিরূপা রায় তাঁর প্রতিভার স্বীকৃতি হিসেবে একাধিক সম্মাননা অর্জন করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেত্রী পুরস্কার — ‘মুনিমজি’ (১৯৫৬)
ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেত্রী পুরস্কার — ‘ছায়া’ (১৯৬২)
ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেত্রী পুরস্কার — ‘শেহনাই’ (১৯৬৫)
ফিল্মফেয়ার আজীবন সম্মাননা পুরস্কার — ২০০৪
এই সম্মাননাগুলো তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন, অভিনয়প্রতিভা এবং ভারতীয় চলচ্চিত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি বহন করে।
প্রয়াণ ও অমর উত্তরাধিকার
২০০৪ সালের ১৩ অক্টোবর, ৭৩ বছর বয়সে মুম্বাইয়ে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন নিরূপা রায়। তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় চলচ্চিত্র হারায় এক অসামান্য শিল্পীকে, যাঁর অভিনয় কয়েক প্রজন্মের দর্শকের আবেগ ও স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।
তাঁর অভিনীত মায়ের চরিত্রগুলো কেবল চলচ্চিত্রের গল্পের অংশ ছিল না; সেগুলো হয়ে উঠেছিল ভারতীয় সমাজে মায়ের ত্যাগ, মমতা ও আত্মমর্যাদার এক আবেগঘন প্রতিচ্ছবি। আজও তাঁর অভিনীত দৃশ্যগুলো দর্শকের মনে নস্টালজিয়া ও আবেগের জন্ম দেয়।
শ্রদ্ধাঞ্জলি
কিছু শিল্পী সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যান না; তাঁদের শিল্পই তাঁদের বাঁচিয়ে রাখে অনন্তকাল। নিরূপা রায় তেমনই একজন কিংবদন্তি, যাঁর চোখের ভাষা, মমতাময়ী অভিব্যক্তি এবং হৃদয়স্পর্শী অভিনয় ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
পর্দায় তিনি ছিলেন অসহায় সন্তানের আশ্রয়, পরিবারের নৈতিক শক্তি এবং নিঃস্বার্থ মাতৃত্বের প্রতীক। তাঁর অভিনয়ের মধ্য দিয়ে মা হয়ে উঠেছিলেন ভালোবাসা, ত্যাগ ও মানবিকতার এক অনন্য প্রতিমূর্তি।
কিংবদন্তি অভিনেত্রী নিরূপা রায়ের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। তাঁর শিল্পকর্ম বেঁচে থাকুক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে, আর ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তাঁর নাম উজ্জ্বল হয়ে থাকুক চিরকাল।
বিনোদন প্রতিবেদক
মোহিত লাল সাহা