অমর অভিনেতা | কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব | ভারতীয় সিনেমার স্বর্ণযুগের অন্যতম পথিকৃৎ
ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু শিল্পী আছেন, যাঁদের অবদান সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে চিরকাল অমলিন থেকে যায়। দাদামণি অশোক কুমার ছিলেন তেমনই একজন অসাধারণ শিল্পী। সাবলীল অভিনয়, স্বাভাবিক অভিব্যক্তি, সংযত সংলাপ উচ্চারণ এবং চরিত্রের গভীরে পৌঁছে যাওয়ার অনন্য ক্ষমতায় তিনি ভারতীয় সিনেমায় সৃষ্টি করেছিলেন এক স্বতন্ত্র অভিনয়ধারা।
আজ, ১৩ অক্টোবর, কিংবদন্তি এই অভিনেতার জন্মবার্ষিকীতে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।
কুমুদলাল থেকে অশোক কুমার—এক কিংবদন্তির উত্থান
১৯১১ সালের ১৩ অক্টোবর, তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বঙ্গ প্রেসিডেন্সির ভাগলপুরে জন্মগ্রহণ করেন কুমুদলাল গঙ্গোপাধ্যায়। পরবর্তী সময়ে তিনিই হয়ে ওঠেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে স্মরণীয় নাম—অশোক কুমার, আর সবার প্রিয় ‘দাদামণি’।
ছোটবেলা থেকেই সিনেমার প্রতি তাঁর ছিল গভীর আকর্ষণ। তবে অভিনয়জগতে আসার ইচ্ছা থাকলেও প্রথমে তিনি সরাসরি অভিনেতা হওয়ার পথে এগোননি। চলচ্চিত্রের প্রযুক্তিগত দিকের প্রতি আগ্রহ থেকে তিনি বম্বে টকিজ স্টুডিওতে ল্যাবরেটরি অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন।
তাঁর ভগ্নিপতি শশধর মুখোপাধ্যায়ের সহযোগিতা এবং বম্বে টকিজের কর্ণধার হিমাংশু রায়ের উদ্যোগে বদলে যায় তাঁর জীবনের গতিপথ। ১৯৩৬ সালে জীবন নইয়া ছবির মাধ্যমে অভিনেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। একই বছর অছুত কন্যা ছবিতে দেবিকা রানির সঙ্গে তাঁর অভিনয় দর্শকমহলে বিশেষ পরিচিতি এনে দেয়।
যে মানুষটি ক্যামেরার পেছনে কাজ করতে এসেছিলেন, তিনিই একদিন হয়ে উঠলেন ক্যামেরার সামনে ভারতীয় সিনেমার অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র!
‘কিসমত’—যে ছবি বদলে দিয়েছিল ভারতীয় সিনেমার ইতিহাস
১৯৪৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত কিসমত অশোক কুমারের অভিনয়জীবনের অন্যতম মাইলফলক। এই ছবিতে তিনি প্রচলিত আদর্শ নায়কের বদলে এক ধূসর, ত্রুটিপূর্ণ ও অ্যান্টি-হিরো চরিত্রে অভিনয় করেন। সেই সময়ের প্রচলিত নায়ক-ভাবনার বাইরে গিয়ে তাঁর এই অভিনয় ভারতীয় মূলধারার চলচ্চিত্রে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়।
ছবিটি বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং কলকাতার রক্সি সিনেমায় দীর্ঘ সময় ধরে প্রদর্শিত হয়। কিসমত শুধু তাঁর তারকাখ্যাতিকেই সুদৃঢ় করেনি, বরং প্রমাণ করেছিল—একজন নায়ককে পর্দায় নিখুঁত হতে হবে না; তাঁর চরিত্রের দুর্বলতা, দ্বন্দ্ব ও মানবিক জটিলতাও দর্শকের হৃদয় জয় করতে পারে।
নায়ক থেকে চরিত্রাভিনেতা—প্রতিটি ভূমিকাতেই অনন্য
অশোক কুমারের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল নিজেকে বারবার নতুন করে আবিষ্কার করার ক্ষমতা। তিনি কখনও রোমান্টিক নায়ক, কখনও রহস্যময় চরিত্রের অধিকারী, কখনও খলনায়ক, আবার কখনও স্নেহময় পিতা কিংবা জীবনের অভিজ্ঞতায় পরিণত এক সাধারণ মানুষ।
১৯৪৯ সালের মহল ছবিতে তাঁর অভিনয় রহস্য ও রোমাঞ্চের আবহকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে। পরবর্তী সময়ে পরিণীতা, হাওড়া ব্রিজ, গুমরাহ, বন্দিনী, আশীর্বাদ, ভিক্টোরিয়া নং ২০৩, ছোটি সি বাত, খট্টা মিঠা এবং খুবসুরত-এর মতো ছবিতে তিনি নিজের অভিনয়বৈচিত্র্যের পরিচয় দিয়েছেন।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য আশীর্বাদ (১৯৬৮)। এই ছবিতে তাঁর হৃদয়স্পর্শী অভিনয়ের জন্য তিনি ১৯৬৯ সালে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। ছবিতে তাঁর আবৃত্তি ও কথনভঙ্গিও দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল।
বাংলা চলচ্চিত্রেও তাঁর অবদান স্মরণীয়। হসপিটাল ও আনন্দ আশ্রম-এর মতো ছবিতে তাঁর উপস্থিতি দুই ভাষার চলচ্চিত্রজগতের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতার পরিচয় বহন করে।
শুধু অভিনেতা নন, ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী
অশোক কুমার ছিলেন এমন এক শিল্পী, যিনি অভিনয়ের পাশাপাশি সংগীত, চিত্রাঙ্কন এবং হোমিওপ্যাথির প্রতিও আগ্রহী ছিলেন। তাঁর দীর্ঘ অভিনয়জীবন কয়েক দশকজুড়ে বিস্তৃত। চলচ্চিত্রের পরিবর্তিত সময়, দর্শকের রুচি এবং অভিনয়ের নতুন ভাষার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছিল।
তাঁর অভিনয়ে অতিরঞ্জনের চেয়ে স্বাভাবিকতা ছিল বেশি; সংলাপের চেয়ে অনেক সময় চোখের ভাষা ও নীরব অভিব্যক্তিই বলে দিত চরিত্রের অন্তর্লীন কথা। পরবর্তী প্রজন্মের বহু অভিনেতার কাছে তাঁর এই অভিনয়রীতি হয়ে উঠেছে অনুপ্রেরণার উৎস।
গাঙ্গুলী পরিবারের গর্ব
অশোক কুমার ছিলেন প্রবাদপ্রতিম সংগীতশিল্পী ও অভিনেতা কিশোর কুমারের বড় দাদা। তাঁদের আরেক ভাই অনুপ কুমারও ছিলেন পরিচিত অভিনেতা। ভারতীয় বিনোদনজগতের ইতিহাসে গাঙ্গুলী পরিবারের অবদান তাই বিশেষভাবে স্মরণীয়।
পুরস্কার ও সম্মাননা
ভারতীয় চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ অশোক কুমার পেয়েছেন বহু সম্মাননা—১৯৫৯: সংগীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার ১৯৬২: পদ্মশ্রী
১৯৬৯: আশীর্বাদ ছবির জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার
১৯৮৮: দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার—ভারতীয় চলচ্চিত্রে আজীবন অবদানের অন্যতম সর্বোচ্চ জাতীয় স্বীকৃতি
১৯৯৯: পদ্মভূষণ
এই সম্মাননাগুলি তাঁর দীর্ঘ শিল্পীজীবন এবং ভারতীয় চলচ্চিত্রের বিকাশে তাঁর অসামান্য অবদানেরই স্বীকৃতি।
প্রয়াণে অবসান, স্মৃতিতে চিরঞ্জীব
২০০১ সালের ১০ ডিসেম্বর, ৯০ বছর বয়সে মুম্বাইয়ে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন দাদামণি অশোক কুমার। তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় চলচ্চিত্র হারিয়েছিল এক মহীরুহকে। কিন্তু শিল্পীর প্রকৃত মৃত্যু হয় না—তাঁর সৃষ্টির মধ্যেই তিনি বেঁচে থাকেন।
আজও তাঁর অভিনীত ছবিগুলি দেখলে বোঝা যায়, অভিনয় মানে কেবল সংলাপ বলা নয়; অভিনয় মানে চরিত্রকে অনুভব করা, তার আনন্দ-বেদনা নিজের মধ্যে ধারণ করা এবং সেই অনুভূতি দর্শকের হৃদয়ে পৌঁছে দেওয়া।
দাদামণি অশোক কুমার সেই বিরল শিল্পীদের একজন, যিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রে নায়ক ও চরিত্রাভিনেতার প্রচলিত সীমারেখাকে অতিক্রম করে অভিনয়ের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন।
জন্মবার্ষিকীতে কিংবদন্তি দাদামণির প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
তাঁর অভিনয়, তাঁর শিল্পবোধ এবং তাঁর সৃষ্টির উত্তরাধিকার প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বেঁচে থাকুক। ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে তাঁর নাম চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি, দাদামণি! আপনার শিল্প অমর, আপনার স্মৃতি চিরভাস্বর।
বিনোদন প্রতিবেদক
মোহিত লাল সাহা