বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২৯, ২০২৬
 শিরোনাম
মধ্যপ্রাচ্যে ২৭টি মার্কিন ঘাঁটিতে আইআরজিসির হামলা সুনামগঞ্জ-এর ছাতক থানা পুলিশের অভিযানে নিয়মিত মামলার ৩ আসামি গ্রেফতার শাহ আমানত বিমানবন্দরে মধ্যপ্রাচ্যের ১০ ফ্লাইট বাতিল এনসিপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ, দেশজুড়ে কর্মসূচি বঙ্গোপসাগরে জলদস্যু দমনে প্রযুক্তিনির্ভর কঠোর নজরদারি-টহল প্রতিমন্ত্রী হয়ে নিজ এলাকায় নুরুল হক ইয়াবা ব্যবসায়ীদের এলাকা ছাড়ার হুঁশিয়ারি: টেকনাফে এমপি শাহজাহান চৌধুরী নগরবাসীর নিরাপত্তায় মধ্যরাতে রাস্তায় আইজিপি: আকস্মিক পরিদর্শনে কড়া বার্তা পাকিস্তান সীমান্তে আফগানিস্তানের হামলা, কাবুল-কান্দাহারে পাল্টা হামলা ফোন করে জামায়াত আমিরের স্বাস্থ্যের খোঁজ নিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

আজ বাংলা চলচ্চিত্রের এক অনন্য শিল্পী, সুরসাধিকা ও পথিকৃৎ নারী পরিচালক অরুন্ধতী দেবী-র প্রয়ান দিবস

আজ বাংলা চলচ্চিত্রের এক অনন্য শিল্পী, সুরসাধিকা ও পথিকৃৎ নারী পরিচালক অরুন্ধতী দেবী-র প্রয়ান দিবস

আজ বাংলা চলচ্চিত্রের এক অনন্য শিল্পী, সুরসাধিকা ও পথিকৃৎ নারী পরিচালক অরুন্ধতী দেবী-র প্রয়ান দিবস

জন্ম: ২৯ এপ্রিল ১৯২৪
প্রয়াণ: ১৬ অক্টোবর ১৯৯০
জন্মস্থান: বরিশাল, অবিভক্ত বাংলা—বর্তমান বাংলাদেশ
বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগে কিছু শিল্পী তাঁদের অভিনয়, ব্যক্তিত্ব ও সৃজনশীলতার মধ্য দিয়ে এমন এক স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন, যা সময়ের সীমানা অতিক্রম করে আজও উজ্জ্বল। অরুন্ধতী দেবী ছিলেন তেমনই এক বিরল প্রতিভা। তিনি ছিলেন অভিনেত্রী, রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী, লেখিকা, সুরকার, চিত্রনাট্যকার, প্রযোজক ও চলচ্চিত্র পরিচালক। পর্দার সৌন্দর্য ও আভিজাত্যের পাশাপাশি তাঁর মধ্যে ছিল গভীর মনন, সাংস্কৃতিক বোধ এবং নিজস্ব শিল্পদৃষ্টির অসাধারণ সমন্বয়।
আজ তাঁর স্মৃতির প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র প্রণাম।

 

জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
অরুন্ধতী দেবীর পৈতৃক নাম ছিল অরুন্ধতী গুহঠাকুরতা। ১৯২৪ সালের ২৯ এপ্রিল তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের অবিভক্ত বাংলার বরিশাল অঞ্চলে এক সংস্কৃতিমনস্ক পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁদের পারিবারিক শিকড় ছিল বরিশালের বানারীপাড়ার গাভা গ্রামে। তাঁর বাবা বিভুচরণ গুহঠাকুরতা ছিলেন একজন আইনজীবী।


পারিবারিক পরিবেশেই তিনি সাহিত্য, সংগীত ও শিল্পকলার প্রতি অনুরাগী হয়ে ওঠেন। তাঁর পরিশীলিত রুচি, মার্জিত ব্যক্তিত্ব এবং শিল্পের প্রতি গভীর নিষ্ঠার পেছনে এই সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।


শৈশব থেকেই সংগীত ও অভিনয়ের সাধনা
অরুন্ধতী দেবীর প্রতিভার বিকাশ ঘটেছিল খুব অল্প বয়স থেকেই। সংগীতের প্রতি তাঁর অনুরাগ তাঁকে রবীন্দ্রসংগীতের জগতে নিয়ে যায়। ঢাকায় সংগীতের প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের পর তিনি কলকাতায় সংগীতচর্চা অব্যাহত রাখেন।
পরবর্তীকালে শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতীর শিক্ষাঙ্গনে তিনি রবীন্দ্রসংগীতের নিবিড় তালিম নেন প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ শৈলজারঞ্জন মজুমদারের কাছে। শান্তিনিকেতনের শিল্পময় পরিবেশ তাঁর সাংস্কৃতিক চেতনা ও সৃজনশীলতাকে আরও সমৃদ্ধ করেছিল।

 

১৯৪০ সালে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী হিসেবে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা হয়। অর্থাৎ, চলচ্চিত্রের পর্দায় পরিচিতি পাওয়ার আগেই সংগীতজগতে তিনি নিজের প্রতিভার পরিচয় দিয়েছিলেন।


মঞ্চ থেকে রুপালি পর্দায়
অভিনয়ের প্রতি তাঁর আকর্ষণও ছিল শৈশব থেকেই। পরবর্তীকালে বাংলা চলচ্চিত্রে আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে তিনি নিজের বহুমুখী প্রতিভাকে আরও বিস্তৃত করেন।
১৯৫২ সালে কার্তিক চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত ‘মহাপ্রস্থানের পথে’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তাঁর রুপালি পর্দার যাত্রা শুরু হয়। ছবিটির হিন্দি সংস্করণ ছিল ‘যাত্রিক’।
এরপর একের পর এক ছবিতে তিনি অভিনয় করে

দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা অর্জন করেন। তাঁর অভিনয়ে ছিল সংযম, গভীরতা, স্বাভাবিক অভিব্যক্তি এবং এক অনন্য আভিজাত্য। তিনি শুধু সৌন্দর্যনির্ভর উপস্থিতির শিল্পী ছিলেন না; চরিত্রের মানসিক জগৎকে উপলব্ধি করে পর্দায় তা ফুটিয়ে তোলার ক্ষমতাও ছিল তাঁর অসামান্য।


স্মরণীয় চলচ্চিত্র ও অভিনয়
অরুন্ধতী দেবীর অভিনয়জীবনের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি চলচ্চিত্র—
মহাপ্রস্থানের পথে (১৯৫২)
চলাচল (১৯৫৬)
বিচারক (১৯৫৯)
ক্ষুধিত পাষাণ (১৯৬০)
ঝিন্দের বন্দী (১৯৬১)
ভগিনী নিবেদিতা (১৯৬২)
জতুগৃহ (১৯৬৪)
সুরের আগুন (১৯৬৫)
হারমোনিয়াম (১৯৭৬)


বিশেষ করে উত্তমকুমারের সঙ্গে জতুগৃহ ছবিতে তাঁর অভিনয় বাংলা চলচ্চিত্রের স্মরণীয় অধ্যায়গুলির অন্যতম। বিচারক এবং ভগিনী নিবেদিতা-র মতো চলচ্চিত্রেও তাঁর অভিনয়শৈলী দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল।


১৯৬২ সালের ভগিনী নিবেদিতা ছবিতে নিবেদিতার চরিত্রে তাঁর অভিনয় বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। এই ছবির জন্য তিনি বাংলা চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির (BFJA) শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর সম্মান লাভ করেন বলে বিভিন্ন জীবনীসূত্রে উল্লেখ রয়েছে।


অভিনেত্রী থেকে পথিকৃৎ চলচ্চিত্র পরিচালক
অরুন্ধতী দেবীর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলির একটি হলো পরিচালনায় তাঁর পদার্পণ। এমন এক সময়ে, যখন চলচ্চিত্র পরিচালনার জগৎ মূলত পুরুষদের নিয়ন্ত্রণে ছিল, তখন তিনি নিজের প্রতিভা ও আত্মবিশ্বাসে সেই পরিসরে স্বতন্ত্র জায়গা করে নেন।

 

১৯৬৭ সালে বিমল করের কাহিনি অবলম্বনে তিনি পরিচালনা করেন ‘ছুটি’। শুধু পরিচালনাই নয়, ছবিটির চিত্রনাট্য রচনা ও সংগীত পরিচালনার কাজেও যুক্ত ছিলেন তিনি। এই চলচ্চিত্রটি উচ্চ সাহিত্যকর্ম অবলম্বনে নির্মিত শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে।

 

‘ছুটি’-র সাফল্য প্রমাণ করেছিল, চলচ্চিত্র পরিচালনায় তাঁর দক্ষতা অভিনয়প্রতিভার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। সাহিত্যবোধ, সংবেদনশীলতা, প্রকৃতির ব্যবহার এবং সংগীতের মেলবন্ধনে তিনি নিজের পরিচালনাশৈলী নির্মাণ করেছিলেন।


পরিচালক হিসেবে উল্লেখযোগ্য কাজ
তাঁর পরিচালিত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলির মধ্যে রয়েছে—
ছুটি (১৯৬৭)
মেঘ ও রৌদ্র (১৯৬৯)
পদিপিসির বর্মি বাক্স (১৯৭২)
দীপার প্রেম (১৯৮৩)
গোকুল (১৯৮৫)


বিশেষ করে লীলা মজুমদারের জনপ্রিয় কিশোরসাহিত্য অবলম্বনে নির্মিত পদিপিসির বর্মি বাক্স তাঁর পরিচালনাজীবনের উল্লেখযোগ্য কাজ। সাহিত্যনির্ভর কাহিনিকে চলচ্চিত্রের ভাষায় রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা ছিল প্রশংসনীয়।
একজন নারী হিসেবে পরিচালনার জগতে তাঁর এই অগ্রযাত্রা পরবর্তী প্রজন্মের নারী চলচ্চিত্রকারদের জন্যও অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে।

 

সংগীত, সাহিত্য ও চলচ্চিত্র—তিনের মেলবন্ধন
অরুন্ধতী দেবীর শিল্পীসত্তার বিশেষত্ব ছিল তাঁর বহুমাত্রিকতা। তিনি একদিকে রবীন্দ্রসংগীতের সাধিকা, অন্যদিকে অভিনয়শিল্পী; আবার চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য, সংগীত ও পরিচালনার মতো সৃজনশীল ক্ষেত্রেও ছিলেন সক্রিয়।

 

১৯৭৬ সালের হারমোনিয়াম ছবিতে তাঁর অংশগ্রহণ তাঁর সংগীতসংশ্লিষ্ট পরিচয়ের কথাও মনে করিয়ে দেয়। তাঁর কাছে চলচ্চিত্র ছিল নিছক বিনোদনের মাধ্যম নয়; বরং সাহিত্য, সংগীত, মানবিক অনুভূতি ও শিল্পচিন্তার সম্মিলিত প্রকাশ।
ব্যক্তিগত প্রচারের চেয়ে কাজের উৎকর্ষ ও সৃজনশীল স্বাধীনতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা তাঁকে সমসাময়িক অনেক শিল্পীর থেকে আলাদা করে তুলেছিল।

 

ব্যক্তিজীবন
অরুন্ধতী দেবীর প্রথম বিবাহ হয় চলচ্চিত্র পরিচালক প্রভাত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। পরবর্তীকালে ১৯৫৭ সালে তিনি বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক তপন সিনহার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।


তপন সিনহার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে দুটি সৃজনশীল ব্যক্তিত্বের জীবনের সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাঁদের পরিবারেও শিল্প, জ্ঞান ও মননের পরিবেশের উপস্থিতি ছিল।


প্রয়াণ ও চিরস্থায়ী উত্তরাধিকার
১৯৯০ সালের ১৬ অক্টোবর অরুন্ধতী দেবীর জীবনাবসান ঘটে কলকাতায়। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া শিল্পকর্ম, সংগীতচর্চা এবং চলচ্চিত্র পরিচালনার দৃষ্টান্ত আজও বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাসে মূল্যবান সম্পদ।


তিনি এমন এক সময়ে নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যখন একজন নারীর পক্ষে অভিনয়ের বাইরে চলচ্চিত্র নির্মাণের মতো ক্ষেত্রে দৃঢ় অবস্থান তৈরি করা সহজ ছিল না। সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তিনি নিজের যোগ্যতা, শিক্ষা, শিল্পবোধ ও সৃজনশীলতার সাহায্যে নিজস্ব পথ নির্মাণ করেছিলেন।


তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃত শিল্পীর পরিচয় শুধু জনপ্রিয়তায় নয়, তাঁর সৃষ্টির গভীরতা, চিন্তার স্বাধীনতা এবং সময়কে অতিক্রম করার ক্ষমতায়।


অরুন্ধতী দেবী ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের এমন এক নক্ষত্র, যাঁর আলো শুধু রুপালি পর্দায় সীমাবদ্ধ ছিল না; তা ছড়িয়ে ছিল সংগীত, সাহিত্য ও নারীসৃজনশীলতার বিস্তৃত আকাশে।
তাঁর স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। বাংলা চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতিতে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকুক।

বিনোদন প্রতিবেদক
মোহিত লাল সাহা