মোঃ আবদুল করিম
লামা, বান্দরবান
একসময় কৃষি, তামাক চাষ, গাছ ও বাঁশের ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল ছিল বান্দরবানের লামা উপজেলার জনসাধারণের আয়ের বড় একটি অংশ। পাহাড়ি জমিতে চাষাবাদ, বনজ সম্পদ এবং স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল বহু পরিবারের জীবিকা নির্বাহের প্রধান অবলম্বন। তবে সময়ের পরিবর্তনে লামার অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে। পাহাড়, নদী, সবুজ বনভূমি ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির কারণে পর্যটন শিল্প এখন এ উপজেলার অন্যতম সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক খাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পর্যটনের আকর্ষণে লামা
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা লামা উপজেলার রয়েছে পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, মাতামুহুরী নদী, সবুজ বনভূমি এবং বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এসব প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক সম্পদ পর্যটকদের আকৃষ্ট করার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। উপজেলার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকা, নদীর তীর, প্রাকৃতিক দৃশ্যের মতো ঐতিহ্যবাহী স্থান পর্যটন বিকাশের সুযোগ তৈরি করেছে।একসময় দুর্গম পাহাড়ি জনপদ হিসেবে পরিচিত লামা বর্তমানে পর্যটনকেন্দ্রিক বিকাশের পথে এগিয়ে যাচ্ছে।
পর্যটন শিল্পে আয়ের নতুন সুযোগ
পর্যটন শিল্পের প্রসার ঘটলে শুধু হোটেল বা রিসোর্ট ব্যবসায়ীদের নয়, স্থানীয় সাধারণ মানুষেরও আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। পর্যটকদের যাতায়াত, থাকা-খাওয়া, কেনাকাটা এবং বিনোদনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা গড়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে—
স্থানীয় তরুণদের পর্যটক গাইড, পরিবহন ও আতিথেয়তা সেবায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি।
পাহাড়ি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উৎপাদিত হস্তশিল্প, ঐতিহ্যবাহী পোশাক, বাঁশ ও বেতের পণ্য বিক্রির বাজার সম্প্রসারণ।
স্থানীয় কৃষিপণ্য, ফলমূল ও খাদ্যসামগ্রীর চাহিদা বৃদ্ধির মাধ্যমে কৃষকদের আয় বাড়ানোর সুযোগ।
পর্যটনকেন্দ্রিক রেস্তোরাঁ, ছোট আবাসন, চা-কফির দোকান এবং অন্যান্য সেবামূলক ব্যবসার বিকাশ।
স্থানীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনধারাকে পর্যটকদের সামনে তুলে ধরার মাধ্যমে সাংস্কৃতিক উদ্যোগের বিকাশ।
এভাবে পর্যটন শিল্প কৃষি ও স্থানীয় ব্যবসার সঙ্গে সমন্বিত হলে লামার অর্থনীতিতে বহুমুখী আয়ের উৎস তৈরি হতে পারে।
সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে
পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা থাকলেও লামায় এ খাতকে টেকসইভাবে গড়ে তুলতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, নিরাপদ যাতায়াত, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, পর্যাপ্ত আবাসন ও পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সেবার মান নিশ্চিত করা জরুরি।
এ ছাড়া পাহাড় কাটা, বন উজাড়, নদী ও প্রাকৃতিক পরিবেশ দূষণ এবং অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের মতো বিষয়গুলো পর্যটন শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই পর্যটন উন্নয়নের পরিকল্পনায় পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার ও স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।একই সঙ্গে কৃষি, বাঁশ ও বেতের পণ্য, স্থানীয় হস্তশিল্প এবং পর্যটন ব্যবসার মধ্যে সমন্বয় সৃষ্টি করা গেলে পুরোনো জীবিকার সঙ্গে নতুন অর্থনৈতিক সুযোগের সংযোগ তৈরি হবে।
লামা উপজেলার অর্থনৈতিক ইতিহাস কৃষি, তামাক চাষ, গাছ ও বাঁশের ব্যবসার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তবে বর্তমান সময়ে পর্যটন শিল্পের বিকাশ এ অঞ্চলের মানুষের সামনে আয়ের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করছে। পরিকল্পিত, পরিবেশবান্ধব ও স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে পর্যটন খাত গড়ে তোলা গেলে লামা শুধু একটি পর্যটন এলাকা হিসেবেই নয়, বরং স্থানীয় কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিতি লাভ করতে পারে।
পর্যটন হোক স্থানীয় মানুষের আয়ের নতুন পথ, প্রকৃতি সংরক্ষণের অঙ্গীকার এবং লামার টেকসই উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি।