নব্বইয়ের দশকে বলিউডের সঙ্গীতজগতে এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছিল — আর সেই অধ্যায়ের প্রথম সারির নায়ক ছিলেন এক বাঙালি তরুণ, কেদারনাথ ভট্টাচার্য, যিনি সারা বিশ্বে পরিচিত হলেন এক নামেই — কুমার শানু।
ঢাকার অদূরে বিক্রমপুরের হাসারা গ্রাম তাঁর পূর্বপুরুষদের নিবাস। বাবা পশুপতি ভট্টাচার্য্য ছিলেন একজন প্রতিভাবান গায়ক ও সুরকার। তাঁর হাত ধরেই ছোটবেলা থেকে গান ও তবলার তাল শেখা শুরু কুমারের। জন্ম ১৯৫৭ সালের ২০ অক্টোবর, কলকাতায়।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাণিজ্যে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি পেশাদারভাবে গান শুরু করেন ১৯৭৯ সালে। সেসময় কলকাতা ও মুম্বইয়ের হোটেলে গান গেয়ে সংসার চালাতে হতো তাঁকে।🌟
গানের জগতে তাঁর বড় সুযোগ আসে কিংবদন্তি সঙ্গীত পরিচালক জুটি কল্যাণজি–আনন্দজির হাত ধরে। তাঁরা কেদারনাথকে গান গাওয়ার সুযোগ দেন এবং দেন এক গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ —
“ভট্টাচার্য নামটা তোমার গায়ে বাঙালিয়ানার ছাপ লাগায়, যা মুম্বইয়ে কেরিয়ারের পথে বাধা হতে পারে। নামটা একটু বদলে নাও।”
সেই থেকেই কেদারনাথ ভট্টাচার্য হয়ে উঠলেন কুমার শানু — আর এখানেই শুরু এক কিংবদন্তির পথচলা
শানু বলেন,
“আমার ডাকনাম ছিল ছানু, আসলে ছানা থেকে এসেছে — আমি ছিলাম একটু গোলগাল, তাই সবাই ‘ছানা’ বলত। সেখান থেকেই ‘ছানু’, পরে ‘শানু’। কল্যাণজি-আনন্দজিই আমাকে এই নাম দেন।”
প্রথমদিকে হোটেলে গান গেয়ে যে টাকা পেতেন, তা দিয়েই নিজের গান রেকর্ড করে বিভিন্ন সঙ্গীত পরিচালকের কাছে নিয়ে যেতেন কাজের আশায়। কিন্তু তখন তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়া হতো এই বলে —
“তুমি তো কিশোর কুমারের মতো গাও, কিশোরদা আছেনই, তোমাকে নেব কেন?”
তবু হাল ছাড়েননি শানু।
অবশেষে গুলশন কুমার তাঁর প্রতিভা চিনতে পারেন। গুলশন কুমারের কোম্পানিতে তিনি ‘কভার সং’ গাইতেন। সেখানেই সুযোগ আসে চলচ্চিত্র “জীনা তেরি গলি মে”-তে — দুটি গানই দারুণ জনপ্রিয় হয়। আর সেখান থেকেই তিনি পৌঁছে যান “আশিকি”-র মতো ইতিহাস গড়া ছবিতে।
‘আশিকি’ ছবির গানগুলো (১৯৯০) কুমার শানুকে রাতারাতি বলিউডের “মেলোডি কিং” বানিয়ে দেয়। এরপর একে একে—
“নজর কে সামনে জিগর কে পাস”
“চুরা কে দিল মেরা”
“ধীরে ধীরে সে মেরি জিন্দেগি মে আনা”
“এক লড়কি কো দেখা তো অ্যায়সা লগা”
— এরকম শত শত গানে শ্রোতাদের হৃদয় জিতে নেন তিনি।
আজও তাঁর কণ্ঠ শুনলেই ফিরে যাওয়া যায় সেই সোনালি যুগে, যখন প্রতিটি সিনেমা মানেই ছিল এক বা একাধিক কুমার শানু হিট গান।
পুরস্কার ও সম্মাননা:
পরপর পাঁচবার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার (১৯৯১–১৯৯৫) — এক নজিরবিহীন অর্জন।
২০০৯ সালে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে দেশের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা “পদ্মশ্রী” প্রাপ্ত।
২৬টি ভাষায় গেয়েছেন প্রায় ২১,০০০-এরও বেশি গান — যা এক অসাধারণ রেকর্ড।🌿
আজও মুম্বই থেকে কলকাতা পর্যন্ত, সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে সমানভাবে ধ্বনিত হয় তাঁর সুরেলা কণ্ঠ।
তিনি কেবল একজন গায়ক নন, এক প্রজন্মের আবেগ, ভালোবাসা আর স্মৃতির অংশ।
আজ কিংবদন্তি শিল্পী কুমার শানুর (কেদারনাথ ভট্টাচার্য্য) ৬৮তম জন্মদিনে রইল জান–ভরা শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা।
তাঁর সুরে যেন চিরকাল বেঁচে থাকে প্রেম, অনুভব আর সংগীতের মাধুর্য।
বিনোদন প্রতিবেদক
মোহিত লাল সাহা