বাংলাদেশের বিনোদনজগতে হাসির রোশনাই ছড়িয়ে যিনি কোটি দর্শকের মন জয় করেছিলেন, তিনি হলেন এ. এফ. এম. আবদুল আলী লালু — যাঁর নাম উচ্চারণ করলেই মনে পড়ে সেই অমলিন সংলাপ,
“কইনছেন দেহি...”
যা আজও আমাদের মুখে মুখে বেঁচে আছে মধুর স্মৃতি হয়ে।
১৯৩২ সালের ২০ অক্টোবর ময়মনসিংহ শহরের চরপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন লালু। পিতা ওয়াজেদ আলী, মাতা জোবেদা খাতুন। ছোটবেলায়ই অভিনয়ের প্রতি গভীর টান তাঁকে মঞ্চে নিয়ে আসে — বাবার পরিচালনায় ‘পল্লী সমাজ’ নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমেই তাঁর সূচনা।
অভিনয়ের টানে তিনি চলে আসেন ঢাকায়। ১৯৬২ সালে সালাহউদ্দিন পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘সূর্য স্নান’ এর মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক ঘটে তাঁর। এরপর একের পর এক চলচ্চিত্রে দর্শক পেয়েছেন এক
অনবদ্য বিনোদনের উপহার—
ধারাপাত, মাটির পাহাড়, রূপবান, নবাব সিরাজউদ্দৌলা, প্রতিকার, কথা দিলাম, পুত্রবধূ, লাল মেমসাহেব, স্বামীর ঘর—সহ শতাধিক সিনেমায় তাঁর অভিনয় আজও স্মরণীয়।
চলচ্চিত্রের পাশাপাশি মঞ্চ, বেতার, টেলিভিশন—সব জায়গাতেই তিনি ছিলেন সমান স্বতঃস্ফূর্ত।
বিশেষ করে আশির দশকে বিটিভিতে ফজলে লোহানীর জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান “যদি কিছু মনে না করেন”-এ তাঁর হাস্যরসাত্মক উপস্থিতি দর্শকদের মন জয় করে নেয়।
তাঁর কৌতুক, অভিব্যক্তি ও সময়জ্ঞান তখনকার টেলিভিশন সংস্কৃতিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।
ত্রিরত্ন, ঘরোয়া, আনোয়ারা, ও বহুরূপী—এইসব ধারাবাহিকেও তিনি হাসির জোয়ার তুলেছিলেন।
চাকরিজীবনে লালু ছিলেন বাংলাদেশ টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন বোর্ডের কর্মকর্তা, সেখান থেকে তিনি অবসর নেন ১৯৮৯ সালে। কিন্তু অভিনয় তাঁর প্রাণ—জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেই ভালোবাসা তিনি ধরে রেখেছিলেন অবিচলভাবে।
২০০৮ সালের ২১ জুলাই, ৭৬ বছর বয়সে তিনি পরলোকগমন করেন।
তবু আজও, আমাদের ঘরে-ঘরে, টেলিভিশনের পর্দায় কিংবা স্মৃতির কোণে বাজে তাঁর সেই সহজ অথচ অমলিন হাসির সুর।
বাংলাদেশের কৌতুক অভিনয়ের পথিকৃৎ এই মানুষটির প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
তিনি প্রমাণ করে গেছেন—
“হাসি শুধু বিনোদন নয়, হাসি এক শক্তি, যা দুঃখ ভুলিয়ে মানুষকে বাঁচার প্রেরণা দেয়।”
স্মরণে লালু ভাই —
যিনি আমাদের মুখে হাসি ফুটিয়ে গেছেন বছরের পর বছর।
“কইনছেন দেহি...” — এই সংলাপের মতোই অমর হয়ে থাকুন আপনি।
বিনোদন প্রতিবেদক
মোহিত লাল সাহা