ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র জমাদানের শেষদিন আজ। এদিকে, বিএনপির দলীয় মনোনয়ন নিয়ে কিশোরগঞ্জ-৫ (বাজিতপুর-নিকলী) আসনে চলছে উতপ্ত পরিবেশ।
প্রথম দিকে এই আসনে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি বিএনপির দলীয় প্রার্থী শেখ মুজিবুর রহমান ইকবালকে। পরবর্তীতে তা বদল করে ১২ দলীয় জোটের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সৈয়দ এহসানুল হুদা নিজ দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগদান করায় ইকবালের মনোনয়ন পরিবর্তন করে এহসানুল হুদাকে বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছে।
এ নিয়ে কিশোরগঞ্জ উতপ্ত এলাকার রাজনৈতিক পরিবেশ। ইকবালের সমর্থকরা রেলপথ অবরোধসহ নানা কর্মসূচি পালন করছেন। এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী জেলা কমিটির আমীর অধ্যাপক মো. রমজান আলী এবং রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ূমও নির্বাচন করবেন বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশে সংস্কারের রাজনীতির স্বপ্নদ্রষ্টা বলে পরিচিত হাসনাত কাইয়ূমের পক্ষে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। এই বিষয়ে উপজেলা বিএনপির সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল বাংলাদেশ বুলেটিন কে বলেন, দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে দলের বাইরের লোকজনকে মনোনয়ন দেওয়ার কারণে বিএনপির নেতাকর্মীরা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। নির্বাচন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন বাজিতপুর-নিখলী জনগণ আমাকে নির্বাচনের জন্য বারবার বলছে , পরবর্তীতে জনগণের সঙ্গে নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অন্যদিকে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ুম বলেন, ‘বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে পরিস্থিতি ভালো না এবং একধরনের আতংক তৈরি করা হচ্ছে এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে একধরনের আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে।’
কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম) আসনে এক সময় আওয়ামী লীগের আধিপত্য থাকলেও এখন বিএনপিও একটি শক্তিশালী দল। এখানে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ সাতবার সংসদ সদস্য হয়েছেন। তিনি রাষ্ট্রপতি হবার পর থেকে তার ছেলে রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক ২০২৪ সাল পর্যন্ত এমপি ছিলেন ।
বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান ইটনার সন্তান। সম্প্রতি তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়ে বক্তব্য দিয়ে দেশব্যাপী বেশ আলোচিত ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন। দুইবার তিনি আবদুল হামিদের বিরুদ্ধে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ায় আব্দুল হামিদকে বেশ কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছিল।
তিনি ২০১৮ সালে রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিকের সাথে বিএনপির মনোনয়নের প্রার্থী হলেও মাঝপথে নির্বাচন বর্জন করেছিলেন। এবার আওয়ামী লীগ দৃশ্যপটে নেই, প্রকাশ্য রাজনীতি নিষিদ্ধ। শীর্ষস্থানীয় নেতা-কর্মীরাও এলাকা ছাড়া। হাওরে আওয়ামী লীগ আর বিএনপি ছাড়া অন্যান্য দলের সাংগঠনিক শক্তি বেশ দুর্বল। এরকম একটি ফাঁকা মাঠ পেয়েও ফজলুর রহমান বেশ চাপে পড়েছেন বলে বিএনপির অনেক নেতা মনে করেন। কারণ, তার বিপক্ষে দলের বেশ কয়েকজন নেতা তৎপর রয়েছেন। আবার গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের বিরদ্ধে মামলা-হামলা হয়েছে। ফলে আওয়ামী লীগের ভোটারগণ ফজলুর রহমানকে ভোট দেবেন বলে মনে করেন না অনেকেই।
ফজলুর রহমান ছাড়াও এই আসনে নির্বাচন করছেন জামায়াত প্রার্থী জেলা ছাত্র শিবিরের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট শেখ রোকন রেজা, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী স্বতন্ত্র প্রার্থী কাজী রেহা কবির সিগমাসহ অন্যান্য কয়েকটি দলের নেতারা। রেহা কবির সিগমা এলাকায় নির্বাচনী গণসংযোগ শুরু করেছেন।
তিনি নির্বাচন কমিশনে নিজের নিরাপত্তা দাবি করে আবেদনও করেছেন। তার কর্মীদের নামে কোন মামলা না থাকার পরও পুলিশ ধরে নিয়ে রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছে বলে তার অভিযোগ। তবে অষ্টগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোহেব খান জানান, যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তদন্তে দোষী পেয়েই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অষ্টগ্রাম থানায় অভ্যুত্থান পরবর্তী তিনটি মামলা হয়েছে।
এ আসনে ভোটার চার লাখ তিন হাজার ৩৮০ জন। হিন্দু ভোটার প্রায় ১২ ভাগ। এর মধ্যে অষ্টগ্রামেই বেশি। তাদের ভূমিকাও জয়-পরাজয়ে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে। এই আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন চেয়েছিলেন হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের সাবেক ট্রাস্টি সুরঞ্জন ঘোষ। তিনি বলেন, তাকে মনোনয়ন দিলে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোট তার পক্ষেই আসত। তিনি মনে করেন, গণঅভ্যুত্থানের পর যেসব মামলা হয়েছে, সেগুলি বিএনপির লোকেরা করেছেন। মামলা বাণিজ্যও করেছেন। এসব কারণে আওয়ামী লীগের এবং তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল ভোটারদের মধ্যে বিএনপির প্রতি একটা ক্ষোভ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
রেহা কবির সিগমা বলেছেন, অষ্টগ্রামে ১২ শতাংশ ভোটার হিন্দু। তাদের প্রতি আমার যেমন সহানুভূতি আছে, আমার প্রতিও তাদের সহানুভূতি আছে। নারীদের মাঝেও ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। তবে আওয়ামী লীগের ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যাবেন কিনা, বলা যাচ্ছে না।
কিশোরগঞ্জ-১ (সদর-হোসেনপুর) আসনে বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম। জামায়াত থেকে জেলা জামায়াতের সাবেক নায়েবে আমীর অধ্যাপক মোসাদ্দেক ভূঁইয়া, গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী সংগঠনের উচ্চতর পরিষদ সদস্য আবু হানিফ, সিপিবি প্রার্থী জেলা কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডাভোকেট এনামুল হক, বাসদ (মার্ক্সবাদী) আলাল মিয়া, বাসদ থেকে মো. মাসুদ মিয়া, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের প্রার্থী অধ্যাপক আজিজুর রহমান, খেলাফত মজলিশের প্রার্থী হেদায়েতুল্লাহ হাদী ও জমিয়তে ইসলামীর প্রার্থী হয়েছেন জেলা কমিটির সভাপতি মাওলানা মাহমুদুল্লাহ জামী। এখানে জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি ২০১৮ সালে মনোনয়নপ্রাপ্ত রেজাউল করিম খান চুন্নু ও সাবেক এমপি মাসুদ হিলালীসহ আরও চারজন মনোনয়ন প্রত্যাশী একজোট হয়ে মনোনয়ন পরিবর্তনের আন্দোলন করছেন।
কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনে বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন পিপি জালাল উদ্দিন। জামায়াতের প্রার্থী কটিয়াদী উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম মোড়ল। এখানে বিএনপির সাবেক এমপি আনিসুজ্জামান খোকন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। এছাড়া সিপিবি প্রার্থী জেলা কমিটির সভাপতি আব্দুর রহমান, এনসিপির প্রার্থী কেন্দ্রীয় সংগঠক আবু সাঈদ উজ্জ্বল ও গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী জেলা কমিটির সভাপতি শফিকুল ইসলামও প্রার্থী হচ্ছেন। এখানে বিএনপির সাবেক এমপি মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান জামায়াতে যোগদান করায় দলটি বেশ আশাবাদী।
কিশোরগঞ্জ-৩ (করিমগঞ্জ-তাড়াইল) আসনে বিএনপির প্রার্থী সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. ওসমান ফারুক। জামায়াত প্রার্থী কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরা সদস্য ডা. জেহাদ খান। তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের শ্যালক।
এখানে এনসিপির প্রার্থী জেলা এনসিপির আহবায়ক শেখ খায়রুল কবির, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের প্রার্থী জেলা কমিটির সভাপতি আলমগীর হোসাইন ও করিমগঞ্জ উপজেলা গণতন্ত্রী পার্টির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন ভূঁইয়াসহ অন্যান্য প্রার্থী রয়েছেন। জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ২০০৮ সালে দলের মনোনয়নপ্রাপ্ত অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম মোল্লা সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলন করে ড. ওসমান ফারুককে বয়সের কারণে শারীরিকভাবে অক্ষম উল্লেখ করে নিজে মনোনয়ন দাবি করেছেন।
কিশোরগঞ্জ-৬ (ভৈরব-কুলিয়ারচর) আসনে বিএনপির প্রার্থী জেলা বিএনপির সভাপতি কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শরীফুল আলম। দলে অন্য কোন মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন না। এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী ভৈরব উপজেলা কমিটির আমীর মাওলানা কবির হুসাইন। এনসিপি প্রার্থী মোজাক্কির আজাদ সাব্বির, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের প্রার্থী মাওলানা আতাউল্লাহ আমিন, খেলাফত মজলিশ প্রার্থী মাওলানা সাইফুল ইসলাম, জাকের পার্টির প্রার্থী জেলা কমিটির সভাপতি আব্দুল হাকিম, ইসলামী আন্দোলন বাংলদেশের প্রার্থী মোহাম্মদ মুসা খান। এখানে সাংগঠনিক শক্তিতে বিএনপি সাংগঠনিক শক্তিতে অন্যান্য দলের তুলনায় অনেক এগিয়ে।
