সৌদি আরব–সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী সংযুক্ত আরব আমিরাত–সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের (এসটিসি) কাছ থেকে হাজরামাউত ও আল-মাহরা গভর্নরেটের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করেছে। ইয়েমেনে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে উপসাগরীয় দুই শক্তিধর আরব রাষ্ট্রের মধ্যে চলমান টানাপোড়েনের মধ্যেই এই সামরিক অগ্রগতি ঘটল।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারের সর্বোচ্চ নির্বাহী সংস্থা প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের (পিএলসি) প্রধান রশাদ আল-আলিমি শনিবার দেওয়া এক বিবৃতিতে জানান, সৌদি সমর্থিত হোমল্যান্ড শিল্ড বাহিনী সৌদি সীমান্তঘেঁষা প্রদেশগুলোতে ‘সব সামরিক ও নিরাপত্তা অবস্থান পুনর্দখল’ করে ‘রেকর্ড সাফল্য’ অর্জন করেছে। তার ভাষায়, এক দিন আগে শুরু হওয়া অভিযানের ফলেই এই সাফল্য এসেছে।
সরকারি সূত্র জানায়, হাজরামাউত প্রদেশের রাজধানী ও পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মুকাল্লার নিয়ন্ত্রণও পুনরায় নেওয়া হয়েছে। গত মাসে এসটিসি শহরটি দখলে নিয়েছিল এবং সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে সৌদি বাহিনীর বিমান হামলা চালানো হয়।
ইয়েমেনি সরকারি সূত্র আল–জাজিরা আরবিকে জানিয়েছে, ইয়েমেনের সবচেয়ে বড় গভর্নরেট হাজরামাউতের সব জেলা বর্তমানে সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। একই সঙ্গে আল-মাহরা গভর্নরেটের যুব দপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ ওমর সুয়াইলাম রোববার তুরস্কের বার্তা সংস্থা আনাদোলুকে বলেন, এসটিসি বাহিনী প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর হোমল্যান্ড শিল্ড বাহিনী গভর্নরেটটির নয়টি জেলার সবকটির দখল নিয়েছে।
ডিসেম্বরের শুরুতে এসটিসি বাহিনী হাজরামাউত ও আল-মাহরা দখল করে নেওয়ার পর থেকেই ইয়েমেনে নজিরবিহীন উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এই দুই প্রদেশ মিলিয়ে দেশটির প্রায় অর্ধেক ভূখণ্ডজুড়ে রয়েছে এবং এগুলো সৌদি আরবের সঙ্গে সরাসরি সীমান্তবর্তী।
আল–জাজিরার ইয়েমেন বিষয়ক সম্পাদক আহমেদ আল-শালাফি বলেন, গত এক দিনে ইয়েমেনের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। তার মতে, ইয়েমেনি সেনাবাহিনী ও হোমল্যান্ড শিল্ড বাহিনীর সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ মাঠপর্যায়ে সংঘাতের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। তিনি আরও জানান, এর ধারাবাহিকতায় ইয়েমেন সরকার সৌদি আরবে সংলাপের জন্য এসটিসিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
সংঘর্ষে প্রাণহানির সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। শুক্রবার থেকে সৌদি সমর্থিত বাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ে অন্তত ৮০ জন এসটিসি যোদ্ধা নিহত হয়েছেন বলে রোববার এক এসটিসি কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানান। তার দাবি অনুযায়ী, আহত হয়েছেন ১৫২ জন এবং ১৩০ জনকে আটক করা হয়েছে। শনিবার এসটিসির এক সামরিক কর্মকর্তা জানান, সৌদি যুদ্ধবিমানগুলো মুকাল্লার পশ্চিমে বারশিদ এলাকায় এসটিসির একটি ঘাঁটিতে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে।
তবে সংঘাতের মধ্যেই সংলাপের সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছে। সৌদি আরবের প্রস্তাবিত আলোচনাকে স্বাগত জানিয়েছে এসটিসি। তারা একে ‘একটি আন্তরিক সুযোগ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে, যা তাদের মতে দক্ষিণ ইয়েমেনের জনগণের আকাঙ্ক্ষা রক্ষায় সহায়ক হতে পারে।
এদিকে হাজরামাউতের সাইয়ুন শহরে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবন ফিরতে শুরু করেছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু করা এবং নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার কাজ শুরু হয়েছে। আল–জাজিরা আরবির তথ্যমতে, হোমল্যান্ড শিল্ড বাহিনী নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর হাজরামাউতের গভর্নর সালেম আহমেদ সাইদ আল-খানবাশি ওয়াদি হাজরামাউতের সাইয়ুন বিমানবন্দরে পৌঁছেছেন।
তবে দক্ষিণ ইয়েমেনের অন্যান্য এলাকায় উত্তেজনা এখনো কাটেনি। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকার অভিযোগ করেছে, বন্দরনগরী এডেনে এসটিসি চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। সরকারের বিবৃতিতে বলা হয়, চিকিৎসার উদ্দেশ্যে আসা অসুস্থ মানুষসহ বহু যাত্রীকে শহরে প্রবেশে বাধা দেওয়া হচ্ছে।
বিবৃতিতে এডেনে চলাচল সীমিত করাকে সংবিধানের গুরুতর লঙ্ঘন ও রিয়াদ চুক্তির সরাসরি ভঙ্গ হিসেবে উল্লেখ করে অবিলম্বে সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে সরকার জানিয়েছে, বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা ও চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রয়টার্সকে দেওয়া এক বক্তব্যে ইয়েমেনি সরকারের এক কর্মকর্তা বলেন, হাজরামাউত থেকে এগিয়ে এসটিসির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এডেনের দিকে অভিযান চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এদিকে, সাময়িক বন্ধের পর এডেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কিছু ফ্লাইট আবার চালু হয়েছে। তবে বিমানবন্দর বন্ধের দায় নিয়ে সরকার, সৌদি আরব ও এসটিসির মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ চলছে।
অন্যদিকে, ইয়েমেনে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস জানিয়েছে, তারা ভারত মহাসাগরে অবস্থিত ইয়েমেনি দ্বীপ সোকোত্রা থেকে ও সেখানে যাওয়ার ফ্লাইট বাতিল বা ঘুরিয়ে দেওয়ার তথ্য পেয়েছে।
