শনিবার, সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬
 শিরোনাম
মধ্যপ্রাচ্যে ২৭টি মার্কিন ঘাঁটিতে আইআরজিসির হামলা সুনামগঞ্জ-এর ছাতক থানা পুলিশের অভিযানে নিয়মিত মামলার ৩ আসামি গ্রেফতার শাহ আমানত বিমানবন্দরে মধ্যপ্রাচ্যের ১০ ফ্লাইট বাতিল এনসিপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ, দেশজুড়ে কর্মসূচি বঙ্গোপসাগরে জলদস্যু দমনে প্রযুক্তিনির্ভর কঠোর নজরদারি-টহল প্রতিমন্ত্রী হয়ে নিজ এলাকায় নুরুল হক ইয়াবা ব্যবসায়ীদের এলাকা ছাড়ার হুঁশিয়ারি: টেকনাফে এমপি শাহজাহান চৌধুরী নগরবাসীর নিরাপত্তায় মধ্যরাতে রাস্তায় আইজিপি: আকস্মিক পরিদর্শনে কড়া বার্তা পাকিস্তান সীমান্তে আফগানিস্তানের হামলা, কাবুল-কান্দাহারে পাল্টা হামলা ফোন করে জামায়াত আমিরের স্বাস্থ্যের খোঁজ নিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি দেশবরেণ্য কণ্ঠশিল্পী জীনাত রেহানা

জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি দেশবরেণ্য কণ্ঠশিল্পী জীনাত রেহানা

জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি দেশবরেণ্য কণ্ঠশিল্পী জীনাত রেহানা

সাগরের তীর থেকে মিষ্টি কিছু হাওয়া এনে,
তোমার কপালে ছোঁয়াবো গো ভাবি মনে মনে..."
আজ ৩ জুলাই। বাংলা গানের সোনালি যুগের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র, দেশবরেণ্য কণ্ঠশিল্পী জীনাত রেহানা-র জন্মদিন। কিন্তু নির্মম নিয়তির পরিহাস—এবার তাঁর জন্মদিনটি এসেছে তাঁকে ছাড়া। জন্মদিনের ঠিক আগের দিন, ২০২৫ সালের ২ জুলাই, তিনি আমাদের ছেড়ে চিরবিদায় নিয়েছেন। তাই আজকের দিনটি আনন্দের নয়, গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও স্মরণের।


১৯৪৮ সালের ৩ জুলাই চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন জীনাত রেহানা। শৈশব থেকেই সংগীতের আবহে বেড়ে ওঠা তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা ছিলেন মা—শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও প্রখ্যাত গীতিকার জেব-উন-নেসা জামাল। তাঁর খালা আঞ্জুমান আরা বেগম-ও ছিলেন স্বনামধন্য সংগীতশিল্পী। বলা যায়, সংগীত ছিল তাঁর উত্তরাধিকার।


চট্টগ্রামের ড. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনপ্রশাসন বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। শিক্ষা ও সংস্কৃতিচর্চা—দুই ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন সমান উজ্জ্বল।
১৯৬৪ সালে বাংলাদেশ বেতারে নিয়মিত শিল্পী হিসেবে এবং ১৯৬৫ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে সংগীত পরিবেশনার মাধ্যমে তাঁর পেশাগত সংগীতজীবনের সূচনা। এরপর কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন, চলচ্চিত্র এবং মঞ্চে অসংখ্য গান পরিবেশন করে তিনি কোটি শ্রোতার হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নেন।
তাঁর কণ্ঠে অমর হয়ে আছে অসংখ্য কালজয়ী গান—
- সাগরের তীর থেকে
-  একটি ফুল আর একটি পাখি
-  আমি কাকন দিয়ে ডেকেছিলেম
-  আমি যার কথা ভাবছি মনে আনমনে
-  আমায় যদি ডাকো কাছে
-  কণ্ঠবীণা
-  মনে রেখো, স্মৃতি থেকে
-  এ চোখে আর কাজল আঁকবো না—সহ অসংখ্য জনপ্রিয় গান।


বিশেষ করে "সাগরের তীর থেকে" গানটি ১৯৬৮ সালে প্রকাশের পর ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং আজও বাংলা গানের শ্রোতাদের আবেগে সমানভাবে বেঁচে আছে। তাঁর গাওয়া অধিকাংশ জনপ্রিয় গানের গীতিকার ছিলেন তাঁর মা জেব-উন-নেসা জামাল। জীনাত রেহানা নিজেই বলতেন—"আমার গাওয়া গান মানেই আমার মায়ের লেখা গান। আমার পঞ্চাশ বছরের সংগীতজীবনে সবচেয়ে বেশি গেয়েছি মায়ের লেখা গান।"


চলচ্চিত্রেও তিনি ছিলেন সমান সফল। অভিশাপ, সাইফুল মুলক বদিউজ্জামাল, ডাক বাবু, মেরে সনম, চাওয়া পাওয়াসহ একাধিক চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করে তিনি চলচ্চিত্র সংগীতেও নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান গড়ে তোলেন।
শুধু আধুনিক গান নয়, আধ্যাত্মিক, দেশাত্মবোধক এবং শিশুতোষ গানেও ছিল তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান। মায়ের রচিত 'জাদুর পেন্সিল' গ্রন্থের শিশুতোষ গানগুলো নতুনভাবে সুরারোপ ও পরিবেশন করেছিলেন তিনি। দীর্ঘ সময় যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করেও বিভিন্ন শহরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নিয়মিত গান গেয়ে বাংলা সংগীতচর্চাকে জীবন্ত রেখেছিলেন।


তাঁর জীবনসঙ্গী ছিলেন বাংলাদেশের টেলিভিশন জগতের কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব মোস্তফা কামাল সৈয়দ। ১৯৬৮ সালে তাঁদের বিবাহ হয়। তাঁদের এক পুত্র ও এক কন্যা রয়েছে।
জীবনের শেষ সময়ে জীনাত রেহানার সবচেয়ে বড় আক্ষেপ ছিল—মা জেব-উন-নেসা জামালের প্রায় দেড় হাজার গান যথাযথভাবে সংরক্ষিত হয়নি। তাই নিজের বয়স ও শারীরিক অসুস্থতাকে উপেক্ষা করেও তিনি মায়ের লেখা গান, বই ও সৃষ্টিকে সংরক্ষণের কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি নিজের গাওয়া গানগুলোও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করার চেষ্টা চালিয়ে গেছেন।


নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের উদ্দেশে তাঁর শেষ দিকের অন্যতম মূল্যবান বার্তা ছিল—
"শিল্পী হও শিল্পের জন্য, কেবল বাণিজ্যের জন্য নয়। প্রতিভার বিকাশ ঘটাও ভালোবাসা থেকে, প্রাপ্তির হিসাব কষে নয়।"
জীনাত রেহানা বিশ্বাস করতেন, ভালো গান মানুষের হৃদয়ের গভীর অনুভূতি থেকে জন্ম নেয়। তাই তাঁর কণ্ঠে গাওয়া প্রতিটি গান আজও আমাদের আবেগ, ভালোবাসা ও স্মৃতির অংশ হয়ে আছে।

আজ তাঁর জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি এই কিংবদন্তি শিল্পীকে। তিনি নেই, কিন্তু তাঁর সুর আছে, তাঁর কণ্ঠ আছে, তাঁর গান আছে। বাংলা সংগীতের ইতিহাসে তাঁর নাম চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি, প্রিয় জীনাত রেহানা।
আপনার সুরের আলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে থাকুক। জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা ও গভীর ভালোবাসা।