বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন গুণী নৃত্যশিল্পী, নৃত্যপরিচালক, অভিনেতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আমির হোসেন বাবু। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি এই অনন্য মানুষটিকে, যিনি নিজ প্রতিভা ও সাধনার মাধ্যমে আমাদের সাংস্কৃতিক ভুবনকে করে তুলেছেন আরও বৈচিত্র্যময় ও গৌরবান্বিত।
ফেনী জেলায় জন্ম নেওয়া এই প্রতিভাধর শিল্পীর শৈশব-কৈশোর কেটেছে পুরান ঢাকার আজিমপুরে। ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও ঢাকা কলেজে পড়াশোনা করেছেন তিনি। নৃত্যশিল্পে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়েছেন বাংলাদেশ ফোকলোর একাডেমি (বাফা) থেকে।
একাত্তরের রক্তঝরা দিনগুলোতে তরুণ বাবু অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য। স্বাধীনতা অর্জনের পর নৃত্যকলা ও চলচ্চিত্রে আত্মনিয়োগ করে হয়ে ওঠেন এই অঙ্গনের এক কিংবদন্তি।
১৯৭৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত দয়াল মুর্শিদ ছিল তাঁর নৃত্য পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র। এরপর একে একে অসংখ্য বিখ্যাত ছবিতে তিনি নৃত্য পরিচালনা করেন— গুন্ডা, অলঙ্কার, নয়নের আলো, কেয়ামত থেকে কেয়ামত, গোলাপী এখন ঢাকায়, রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত, বিয়ের ফুল, মেঘলা আকাশ, এবং হাসন রাজা সহ আরও বহু সিনেমা, যেগুলো আজও দর্শকের হৃদয়ে বেঁচে আছে।
নৃত্য পরিচালনার পাশাপাশি অভিনয়শিল্পেও রেখেছেন নিজের স্বাক্ষর। আবার তোরা মানুষ হ, দাতা হাতেমতাঈ, অন্তরে ঝড়, প্রেমিক, হৃদয়ের বন্ধন – এমন বহু ছবিতে তাঁর উপস্থিতি দর্শক হৃদয়ে প্রশংসিত হয়েছে।
তাঁর অনন্য কীর্তির স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার –
১৯৯২ সালে বেপরোয়া ছবির জন্য,
২০০১ সালে মেঘলা আকাশ ছবির জন্য শ্রেষ্ঠ নৃত্যপরিচালক সম্মাননা।
ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিনের সহধর্মিণী। তাঁদের একমাত্র পুত্র শ্রাবণ বর্তমানে যুক্তরাজ্য প্রবাসী।
সদা হাস্যোজ্জ্বল, খোশমেজাজি, বন্ধুবৎসল ও প্রাণবন্ত এই মানুষটি সবার প্রিয় ছিলেন চলচ্চিত্র পাড়ায়। বাংলাদেশের নৃত্যশিল্পে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
২০০৩ সালের ৯ জুলাই মাত্র ৫১ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন গুণী এই শিল্পী।
আজ তাঁর মৃত্যুদিনে আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি—
এই বীর মুক্তিযোদ্ধা, বরেণ্য নৃত্যশিল্পী ও চলচ্চিত্রের নিবেদিতপ্রাণ এক সৃজনমানুষকে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি।
অমর হোক আমির হোসেন বাবুর শিল্পকীর্তি ও স্মৃতি।