শনিবার, আগস্ট ১, ২০২৬
 শিরোনাম
মধ্যপ্রাচ্যে ২৭টি মার্কিন ঘাঁটিতে আইআরজিসির হামলা সুনামগঞ্জ-এর ছাতক থানা পুলিশের অভিযানে নিয়মিত মামলার ৩ আসামি গ্রেফতার শাহ আমানত বিমানবন্দরে মধ্যপ্রাচ্যের ১০ ফ্লাইট বাতিল এনসিপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ, দেশজুড়ে কর্মসূচি বঙ্গোপসাগরে জলদস্যু দমনে প্রযুক্তিনির্ভর কঠোর নজরদারি-টহল প্রতিমন্ত্রী হয়ে নিজ এলাকায় নুরুল হক ইয়াবা ব্যবসায়ীদের এলাকা ছাড়ার হুঁশিয়ারি: টেকনাফে এমপি শাহজাহান চৌধুরী নগরবাসীর নিরাপত্তায় মধ্যরাতে রাস্তায় আইজিপি: আকস্মিক পরিদর্শনে কড়া বার্তা পাকিস্তান সীমান্তে আফগানিস্তানের হামলা, কাবুল-কান্দাহারে পাল্টা হামলা ফোন করে জামায়াত আমিরের স্বাস্থ্যের খোঁজ নিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

আজ আবৃত্তি, নাটক, উপস্থাপনা ও মডেলিং জগতের এক উজ্জ্বল নাম ক্যামেলিয়া মোস্তফার মৃত্যুবার্ষিকী

আজ আবৃত্তি, নাটক, উপস্থাপনা ও মডেলিং জগতের এক উজ্জ্বল নাম ক্যামেলিয়া মোস্তফার মৃত্যুবার্ষিকী

আজ আবৃত্তি, নাটক, উপস্থাপনা ও মডেলিং জগতের এক উজ্জ্বল নাম ক্যামেলিয়া মোস্তফার মৃত্যুবার্ষিকী

কিছু মানুষ আলো হয়ে আসেন, কিন্তু সময়ের স্রোতে ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যান। তবুও তাঁদের সৃষ্টি, কণ্ঠ আর ব্যক্তিত্ব থেকে যায় স্মৃতির গভীরে।"
বাংলাদেশের আবৃত্তি, নাটক, উপস্থাপনা ও মডেলিং জগতের এক উজ্জ্বল নাম ছিলেন ক্যামেলিয়া মুস্তাফা। একসময় তিনি ছিলেন বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারের অত্যন্ত পরিচিত মুখ। সুললিত কণ্ঠ, প্রমিত উচ্চারণ, মার্জিত ব্যক্তিত্ব এবং অনন্য উপস্থাপনা তাঁকে সমকালীন শিল্পীদের মধ্যে আলাদা মর্যাদা এনে দিয়েছিল। অথচ আজকের প্রজন্মের অনেকেই তাঁর নাম পর্যন্ত জানে না—এটাই আমাদের সাংস্কৃতিক বিস্মৃতির এক নির্মম বাস্তবতা।


১৯৭৩ সালে আবৃত্তিশিল্পী হিসেবে বাংলাদেশ টেলিভিশনে তাঁর আত্মপ্রকাশ। তাঁর সাবলীল উচ্চারণ, কণ্ঠের মাধুর্য ও ব্যক্তিত্ব খুব দ্রুতই নির্মাতাদের নজর কাড়ে। এরপর জিয়া আনসারী পরিচালিত জনপ্রিয় নাটক ‘তিন ঘণ্টার বিরতি’-তে আসাদুজ্জামান নূরের বিপরীতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করে তিনি ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেন।
পরবর্তীকালে মুস্তফা কামাল সৈয়দ, মুস্তাফিজুর রহমান ও মুসা আহমেদের মতো খ্যাতিমান নির্মাতাদের পরিচালনায় প্রায় ১৮টি নাটকে অভিনয় করেন। তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য নাটকের মধ্যে রয়েছে—


শেষ বংশধর, তুমি রবে নীরবে, অন্য আকাশ, অলৌকিক, সোনালি এক নদী প্রভৃতি।
তিনি ছিলেন বাংলাদেশ টেলিভিশনের 'এ' গ্রেডভুক্ত শিল্পী।
ক্যামেলিয়া মুস্তাফা ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম দিকের শীর্ষস্থানীয় মডেলদের অন্যতম। প্রায় ৮০টি টেলিভিশন বিজ্ঞাপনে অংশ নিয়েছিলেন তিনি।
এর মধ্যে 'পুষ্পরাজ' তেলের বিজ্ঞাপন ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয়, যা টানা প্রায় ২৪ বছর বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত হয়েছিল—বাংলাদেশের বিজ্ঞাপনের ইতিহাসে যা এক অনন্য দৃষ্টান্ত।


অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি ছিলেন দক্ষ উপস্থাপক। বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘সুরবাণী’ ও ‘পরিক্রমা’ উপস্থাপনা করে দর্শকদের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছিলেন।
বাংলাদেশ বেতারের বৈদেশিক কার্যক্রমেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এছাড়া অস্ট্রেলিয়ান রেডিওর বিভিন্ন অনুষ্ঠান পরিচালনা ও উপস্থাপনাও করেছেন।


নব্বইয়ের দশকের শুরুতে পালক পিতা গোলাম মুস্তাফার আবৃত্তিকৃত কবিতা নিয়ে ‘প্রাঙ্গণে মোর’ শিরোনামে একটি অ্যালবাম প্রকাশ করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে পড়াশোনা করেন তিনি। কর্মজীবনের শুরু একটি অনাথ আশ্রমে চাকরির মাধ্যমে। পরে বিভিন্ন বিদেশি দূতাবাসে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন এবং দক্ষতা অর্জন করেন একাধিক বিদেশি ভাষায়।
ক্যামেলিয়া মুস্তাফার জন্ম এক অনন্য সাহিত্য-সংস্কৃতিমনা পরিবারে।


তাঁর জন্মদাতা পিতা ছিলেন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক শামসুদ্দীন আবুল কালাম এবং মাতা ছিলেন খ্যাতিমান বেতার নাট্যশিল্পী হোসনে আরা বিজু।
পিতামাতার বিচ্ছেদের পর বিজু বিয়ে করেন কিংবদন্তি অভিনেতা ও আবৃত্তিশিল্পী গোলাম মুস্তাফাকে। তাঁর স্নেহ-ভালোবাসাতেই ক্যামেলিয়ার বেড়ে ওঠা। গোলাম মুস্তাফাকেই তিনি নিজের পিতার মর্যাদা দিতেন।


তাঁর ছোট বোন হলেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী, সাবেক সংসদ সদস্য এবং সবার প্রিয় *‘রাবু আপা’*খ্যাত সুবর্ণা মুস্তাফা।
জীবনের শেষদিকে তিনি নিজের পরিচয়ে ‘ক্যামেলিয়া কমল’ নাম ব্যবহার করতেন।
চলচ্চিত্রে অভিনয়ের অসংখ্য প্রস্তাব পেলেও তিনি কখনো চলচ্চিত্রে অভিনয় করেননি। ছোটপর্দা, আবৃত্তি, উপস্থাপনা ও সংস্কৃতিচর্চাকেই নিজের শিল্পজীবনের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।
খ্যাতি, সম্মান ও জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করলেও জীবনের শেষভাগ ছিল অনেকটাই নিভৃত ও নিঃসঙ্গ।


দীর্ঘ সময় প্রবাসে কাটিয়ে দেশে ফিরে এলেও তিনি ধীরে ধীরে রেডিও ও টেলিভিশনের মূলধারা থেকে দূরে সরে যান। মাঝেমধ্যে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে দেখা মিললেও নিজেকে অনেকটাই আড়ালে রেখেছিলেন।


২০২৪ সালের ১৬ জুলাই, রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
আজ তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি এক বহুমাত্রিক শিল্পীকে, যিনি আবৃত্তি, অভিনয়, উপস্থাপনা ও মডেলিং—প্রতিটি ক্ষেত্রেই রেখে গেছেন স্বতন্ত্র স্বাক্ষর।
সময়ের নির্মমতায় অনেকেই তাঁকে ভুলে গেছেন, কিন্তু বাংলাদেশের সংস্কৃতির ইতিহাসে তাঁর অবদান কখনো মুছে যাওয়ার নয়।
আপনি ভালো ছিলেন, ক্যামেলিয়া। কিন্তু শেষ জীবনে ঠিক ভালো থাকতে পারেননি—সেটাও আমরা জানি।
স্মৃতির আকাশে আজও ভেসে ওঠে সেই শান্ত, স্নিগ্ধ, অনুপম মুখ।