বাংলা সংগীতের ইতিহাসে কিছু নাম সময়কে অতিক্রম করে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। তাঁদেরই অন্যতম আঙুরবালা দেবী—যাঁর সুরেলা কণ্ঠ, অসাধারণ গায়কি ও নিরলস সাধনা বাংলা গানকে দিয়েছে এক অনন্য উচ্চতা। নজরুলগীতি, বাংলা আধুনিক গান, গজল, কীর্তন, দাদরা, ঠুংরি, নাট্যসংগীত—প্রতিটি ধারাতেই তিনি ছিলেন সমান উজ্জ্বল। তাই তাঁকে বলা হতো ‘বাংলার বুলবুল’ এবং ‘কলকাত্তা কি কোয়েল’।
তাঁর প্রকৃত নাম ছিল প্রভাবতী দেবী। ১৯০৬ সালের ২৩ জুলাই কলকাতার কাশীপুরে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ছিলেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁদের আদি নিবাস ছিল বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার ইন্দাসে। শৈশব থেকেই তাঁর অসাধারণ সংগীতপ্রতিভার প্রকাশ ঘটে। মাত্র সাত বছর বয়সে পিতৃবন্ধু অমূল্য মজুমদারের কাছে সংগীতশিক্ষা শুরু করেন। পরে খেয়াল, ঠুংরি, দাদরা, কীর্তন ও গজলে শিক্ষা নেন ঈষাণ ঠাকুর, ওস্তাদ জমীরুদ্দিন খাঁসহ তৎকালীন খ্যাতিমান গুরুদের কাছে।
নৃত্যগুরু ললিত মোহন গোস্বামী তাঁকে থিয়েটারের জগতে নিয়ে আসেন এবং তখনই তাঁর নাম রাখা হয় ‘আঙুরবালা’। খুব অল্প বয়সেই গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে তাঁর প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়—
বাঁধ না তরীখানি আমার এ নদীকূলে’।
আঙুরবালা দেবীর শিল্পীজীবনের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় যুক্ত হয়ে আছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে। নজরুল তাঁকে নিজের শিষ্যা হিসেবে গ্রহণ করেন এবং তাঁর কণ্ঠে অসংখ্য নজরুলগীতি রেকর্ড করান। নজরুলের বিখ্যাত গীতিসংকলন ‘বুলবুল’-এর বহু গান তাঁর কণ্ঠে অমর হয়ে আছে। উল্লেখযোগ্য গানগুলোর মধ্যে রয়েছে—
ভুলি কেমনে আজও যে মনে’
‘এত জল ও কাজল চোখে’
‘নিশি ভোর হলো জাগিয়া’।
বাংলা, হিন্দি ও উর্দু ভাষায় প্রায় পাঁচ শতাধিক গানে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি। নজরুলগীতির পাশাপাশি রবীন্দ্রসংগীত, কীর্তন, গজল ও আধুনিক গানেও তাঁর দক্ষতা ছিল ঈর্ষণীয়।
শুধু সংগীতশিল্পী নন, তিনি ছিলেন একজন সফল মঞ্চাভিনেত্রী ও চলচ্চিত্র অভিনেত্রী। মিনার্ভা থিয়েটারে অসংখ্য নাটকে অভিনয় করেছেন। কাজী নজরুল ইসলাম পরিচালিত চলচ্চিত্রেও অভিনয় করে তিনি অভিনয়জগতেও নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন।
আরও একটি ঐতিহাসিক তথ্য হলো—কলকাতা বেতার কেন্দ্রের প্রথম দিনের সম্প্রচারে প্রথম শিল্পী ছিলেন আঙুরবালা দেবী। সেই সঙ্গে ভারতের বিভিন্ন রাজা-মহারাজার দরবারে সংগীত পরিবেশন করে তিনি অর্জন করেন বিরল সম্মান ও জনপ্রিয়তা।
সম্মাননা ও স্বীকৃতি-সঙ্গীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার
১৯৬৩ সালে কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডি.লিট. উপাধি
১৯৭২ সালে আঙুরবালা দেবী, ইন্দুবালা ও কমলা ঝাড়িয়াকে নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘তিনকন্যা’ তাঁকে নতুন প্রজন্মের কাছে আরও পরিচিত করে তোলে।
১৯৮৪ সালের ৬ জানুয়ারি বাংলা সংগীতের এই উজ্জ্বল নক্ষত্র চিরবিদায় নেন। কিন্তু তাঁর কণ্ঠে ধারণ করা অসংখ্য অমর গান আজও বাংলা সংগীতের অমূল্য সম্পদ হয়ে বেঁচে আছে। উত্তর কলকাতার দুর্গাচরণ মিত্র স্ট্রিটের তাঁর বাসভবন আজও এক গৌরবময় শিল্পীজীবনের নীরব সাক্ষী।
জন্মবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র স্মরণ।
আপনার কণ্ঠে বাংলা গান পেয়েছে এক অনন্য ঐশ্বর্য। নজরুলসংগীতের ইতিহাসে এবং বাংলা সংগীতের আকাশে আপনি চিরদিন দীপ্ত নক্ষত্র হয়ে থাকবেন।