তাঁকে নিয়ে আলোচনা আছে, সমালোচনাও আছে। তাঁর গান, রাজনৈতিক অবস্থান, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য—সবকিছু নিয়েই নানা সময়ে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। কিন্তু তাঁকে উপেক্ষা করা সহজ নয়—এই ধ্রুবসত্যটি স্বীকার করতেই হয়।
কারণ নচিকেতা শুধু একজন সংগীতশিল্পী নন; তিনি বাংলা গানের একটি যুগের নাম। নব্বইয়ের দশকে একটি নির্দিষ্ট প্রজন্মের জীবন, হতাশা, প্রেম, ক্ষোভ, মধ্যবিত্তের সংকট, সামাজিক বৈষম্য ও নাগরিক বাস্তবতার ভাষা হয়ে উঠেছিলেন তিনি।
নচিকেতা মানেই ‘নীলাঞ্জনা’, আবার নচিকেতা মানেই ‘বৃদ্ধাশ্রম’।
একদিকে প্রেম ও আবেগ, অন্যদিকে সমাজের কঠিন বাস্তবতা—দুই বিপরীত মেরুকে তিনি একই কণ্ঠে, একই স্বচ্ছন্দতায় ধারণ করেছেন।
‘এই বেশ ভালো আছি’—তারপর বদলে গেল বাংলা গানের ভাষা-
উত্তর কলকাতার মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র কলেজে পড়ার সময় থেকেই গান লেখা ও নিজের মতো করে গান গাওয়ার চর্চা শুরু করেন নচিকেতা। ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম একক অ্যালবাম ‘এই বেশ ভালো আছি’। অ্যালবামটি প্রকাশের পরপরই তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
নচিকেতার গানে ছিল প্রচলিত রোমান্টিকতার বাইরে এক নতুন স্বর। কথ্য ভাষা, নাগরিক জীবনের অভিজ্ঞতা, সামাজিক অসঙ্গতি এবং ব্যক্তিমানুষের না-বলা কথাকে তিনি গানের বিষয় করে তুললেন। বাংলা গানের শ্রোতারা যেন নিজেদের জীবনকে নতুন করে শুনতে পেলেন তাঁর গানে।
এই ধারাকেই পরবর্তীতে জনপ্রিয়ভাবে ‘জীবনমুখী গান’ বলা হয়। নচিকেতা, কবীর সুমন, শিলাজিৎ প্রমুখ শিল্পীর হাত ধরে নব্বইয়ের দশকে বাংলা গানে যে নতুন ভাষা ও ভাবনার উন্মেষ ঘটেছিল, নচিকেতা তার অন্যতম প্রধান মুখ।
‘নীলাঞ্জনা’ থেকে ‘বৃদ্ধাশ্রম’--
নচিকেতার গানের সবচেয়ে বড় শক্তি—তিনি মানুষের গল্প বলেন।
প্রেমিকের একাকিত্ব, মধ্যবিত্তের অসহায়তা, বেকার যুবকের হতাশা, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের নিঃসঙ্গতা, সমাজের ভণ্ডামি কিংবা সম্পর্কের টানাপোড়েন—কোনো বিষয়ই তাঁর গানের বাইরে নয়।
তাঁর ‘নীলাঞ্জনা’ যেমন এক প্রজন্মের প্রেম ও তারুণ্যের আবেগকে ধারণ করেছে, তেমনি ‘বৃদ্ধাশ্রম’ হয়ে উঠেছে বদলে যাওয়া পারিবারিক সম্পর্ক ও বার্ধক্যের নিঃসঙ্গতার এক মর্মস্পর্শী প্রতীক।
তাঁর গানের ভাষা ছিল সহজ, কিন্তু বক্তব্য ছিল গভীর। আর সেই কারণেই তাঁর গান শুধু একটি সময়ের জনপ্রিয় গান হয়ে থাকেনি; বহু বছর পরও নতুন প্রজন্মের শ্রোতার কাছে সেগুলো প্রাসঙ্গিক হয়ে আছে।
১৯৯৩-এর পর একে একে এসেছে *‘কে যায়’, ‘কি হবে’, ‘চলে যাব তোকে নিয়ে’, ‘কুয়াশা যখন’, ‘আমি পারি’, ‘দলছুট’, ‘দায়ভার’, ‘একলা চলতে হয়’, ‘এই আগুনে হাত রাখো’, ‘তীর্যক’, ‘এবার নীলাঞ্জনা’, ‘হাওয়া বদল’*সহ বহু অ্যালবাম।
শুধু গায়ক নন, গীতিকার ও সুরকারও--
নচিকেতার স্বাতন্ত্র্য এখানেই—তিনি শুধু অন্যের লেখা গান গাওয়া শিল্পী নন। নিজের গান নিজেই লিখেছেন, সুর করেছেন এবং কণ্ঠ দিয়েছেন। তাঁর সৃষ্টিশীলতার বিস্তার অ্যালবামের বাইরেও চলচ্চিত্রের গান ও সংগীত পরিচালনায় পৌঁছেছে।
বাংলা চলচ্চিত্রের পাশাপাশি হিন্দি চলচ্চিত্রেও তাঁর সংগীত-সংশ্লিষ্ট কাজ রয়েছে। তিনি ‘হঠাৎ বৃষ্টি’ চলচ্চিত্রের অন্যতম সংগীত পরিচালক ছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্রের জন্য গান ও সংগীত পরিচালনার কাজ করেছেন।
তাঁর নিজের ভাষায়, তিনি সফলতার পেছনে ছোটেননি; বরং ছুটেছেন সৃজনশীলতার পেছনে। এই মানসিকতাই সম্ভবত তাঁকে দীর্ঘ সময় ধরে স্বতন্ত্র অবস্থান ধরে রাখতে সাহায্য করেছে।
মঞ্চে নচিকেতা মানেই অন্যরকম উন্মাদনা--
নচিকেতাকে ঘিরে শ্রোতাদের যে আবেগ, তা আজও বিস্ময়কর। সময় বদলেছে, শ্রোতার প্রজন্ম বদলেছে, গানের মাধ্যম বদলেছে—কিন্তু নচিকেতার মঞ্চে ওঠার মুহূর্তে সেই পুরোনো উচ্ছ্বাস যেন আবার ফিরে আসে।
তাঁর দীর্ঘ সংগীতজীবনে নানা ওঠাপড়া এসেছে। অসুস্থতা নিয়ে গুজব ছড়িয়েছে, নানা সময়ে তাঁকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে; কিন্তু প্রতিবারই তিনি নিজের গান ও মঞ্চের মাধ্যমে ফিরে এসেছেন। তাঁর শ্রোতারাই যেন তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি।
নচিকেতা—একজন স্পষ্টবাদী শিল্পী--
শুধু গান নয়, নিজের রাজনৈতিক মত ও সামাজিক অবস্থান নিয়েও নচিকেতা বরাবরই স্পষ্টবাদী। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে বিস্তর। বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, প্রয়াত সুভাষ চক্রবর্তীর সঙ্গে পরিচয় এবং পরবর্তী সময়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক—সবই জনপরিসরে আলোচিত হয়েছে।
তবে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরেও নচিকেতার শিল্পীসত্তা স্বতন্ত্র। ২০১৯ সালের এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেকে ‘প্রাইভেট মার্ক্সিস্ট’ বলে বর্ণনা করেছিলেন এবং তাঁর রাজনৈতিক ভাবনা ও ব্যক্তিগত অবস্থান নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছিলেন।
অর্থাৎ তাঁকে ভালোবাসুন কিংবা তাঁর সঙ্গে মতের অমিল রাখুন—নচিকেতাকে নিয়ে কথা বলতেই হয়। কারণ তাঁর গান শুধু বিনোদন দেয়নি; অনেক সময় প্রশ্ন করেছে, অস্বস্তিতে ফেলেছে, ভাবিয়েছে এবং সমাজের আয়নাটি সামনে ধরেছে।
বাংলাদেশও তাঁর শিকড়ের অংশ--
নচিকেতা কলকাতায় জন্মগ্রহণ করলেও তাঁর পারিবারিক শিকড় বাংলাদেশের পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া অঞ্চলে। তাঁর পৈতৃক সূত্র বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত। তাই দুই বাংলার সাংস্কৃতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও নচিকেতা এক পরিচিত নাম।
আজ তাঁর জন্মদিন।
একটি প্রজন্মের তারুণ্য, প্রেম, ক্ষোভ, প্রতিবাদ, অভিমান ও জীবনসংগ্রামের সঙ্গে যে কণ্ঠ মিশে আছে—সেই কণ্ঠের শিল্পীকে জন্মদিনে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা।
নচিকেতা মানে শুধু কিছু জনপ্রিয় গান নয়;
নচিকেতা মানে একটি সময়ের দলিল।
নচিকেতা মানে প্রশ্ন করতে শেখা।
নচিকেতা মানে নিজের ভাষায় নিজের কথা বলা।
যে শিল্পী একদিন গেয়েছিলেন মানুষের না-বলা কথাগুলো, আজও তাঁর গান নতুন প্রজন্মের কাছে ফিরে ফিরে আসে—এটাই একজন সৃষ্টিশীল শিল্পীর সবচেয়ে বড় সার্থকতা।
শুভ জন্মদিন, নচিকেতা চক্রবর্তী।
আপনার কণ্ঠে, কথায় ও সৃষ্টিতে বাংলা গান আরও বহুদিন তার নিজস্ব জীবন খুঁজে পাক—এই শুভকামনা। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।
সৃষ্টিশীল থাকুন। গান দিয়ে মানুষকে ভাবাতে থাকুন।