ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে হাস্যরসের কথা উঠলেই যে কজন শিল্পীর নাম সর্বাগ্রে উচ্চারিত হয়, তাঁদের অন্যতম মেহমুদ আলী, যিনি সবার কাছে শুধু মেহমুদ নামেই পরিচিত। অসাধারণ কমিক টাইমিং, অনন্য সংলাপ উপস্থাপন, প্রাণবন্ত অভিনয় এবং স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব দিয়ে তিনি চার দশকেরও বেশি সময় ধরে হিন্দি চলচ্চিত্রে দর্শকদের হাসিয়েছেন, কাঁদিয়েছেন এবং মুগ্ধ করেছেন। আজ তাঁর ২২তম মৃত্যুদিবসে জানাই গভীর শ্রদ্ধা।
১৯৩২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর তৎকালীন বোম্বেতে (বর্তমান মুম্বাই) জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পিতা মমতাজ আলী ছিলেন বিখ্যাত চলচ্চিত্র অভিনেতা ও নৃত্যশিল্পী এবং মা লতিফুন্নিসা। শিল্পমনা পরিবারে বেড়ে ওঠায় অভিনয়ের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয় খুব ছোটবেলাতেই। তাঁর বোন মিনু মমতাজ ছিলেন বলিউডের জনপ্রিয় নৃত্যশিল্পী ও অভিনেত্রী এবং ছোট ভাই আনোয়ার আলী ছিলেন অভিনেতা ও প্রযোজক।
শিশুশিল্পী হিসেবে ‘কিসমত’ (১৯৪৩) চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রজগতে তাঁর যাত্রা শুরু হলেও সাফল্যের পথ মোটেও সহজ ছিল না। জীবিকার তাগিদে তিনি কখনও মুরগির পণ্য বিক্রি করেছেন, কখনও আবার পরিচালক পি. এল. সন্তোষী-এর গাড়িচালক হিসেবেও কাজ করেছেন। কঠোর সংগ্রাম, অধ্যবসায় এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তিই তাঁকে পরবর্তীকালে বলিউডের সর্বকালের অন্যতম জনপ্রিয় কৌতুক অভিনেতায় পরিণত করে।
১৯৫০-এর দশকে ‘সিআইডি’, ‘দো বিঘা জমিন’, ‘পিয়াসা’-সহ একাধিক চলচ্চিত্রে ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে নিজের প্রতিভার পরিচয় দেন। এরপর ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন চলচ্চিত্রের অপরিহার্য মুখ। তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলো কখনো ছিল নায়কের বন্ধু, কখনো সাধারণ মানুষ, আবার কখনো উদ্ভট অথচ হৃদয়স্পর্শী এক কমেডিয়ান—যিনি হাসির মধ্যেও জীবনের গভীর সত্য তুলে ধরতেন।
তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে—
-ছোটে নবাব (১৯৬১)
- পড়োসন (১৯৬৮)
- গুমনাম
- পেয়ার কিয়ে যা
- বম্বে টু গোয়া
- কুঁয়ারা বাপ (১৯৭৪)
- সবসে বড়া রুপাইয়া
- জিনে কি রাহ
- আন্দাজ আপনা আপনা (১৯৯৪) — তাঁর শেষ দিকের স্মরণীয় অভিনয়।
তাঁর অধিকাংশ জনপ্রিয় গানে কণ্ঠ দিয়েছিলেন কিংবদন্তি শিল্পী মান্না দে। দুজনের যুগলবন্দি বলিউডে হাস্যরসাত্মক সংগীতের এক অনন্য অধ্যায় সৃষ্টি করে।
মেহমুদ শুধু একজন অভিনেতাই ছিলেন না; তিনি ছিলেন অসংখ্য প্রতিভার পৃষ্ঠপোষকও। ভারতীয় চলচ্চিত্রে নতুন প্রতিভা তুলে আনার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান—
কিংবদন্তি সুরকার আর. ডি. বর্মণকে প্রথম স্বাধীনভাবে সংগীত পরিচালনার সুযোগ দেন ‘ছোটে নবাব’ (১৯৬১) চলচ্চিত্রে।
সুরকার রাজেশ রোশনকে পরিচয় করিয়ে দেন তাঁর প্রযোজিত ‘কুঁয়ারা বাপ’ (১৯৭৪) চলচ্চিত্রের মাধ্যমে।
মহানায়ক অমিতাভ বচ্চনকে মূলধারার বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ করে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং তাঁর ক্যারিয়ারের শুরুর সময়ে পাশে দাঁড়ান।
চার দশকের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি তিন শতাধিকেরও বেশি হিন্দি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। ফিল্মফেয়ার পুরস্কারে ২৫ বার মনোনয়ন পাওয়া বিরল শিল্পীদের একজন ছিলেন তিনি। এর মধ্যে ১৯ বার মনোনয়ন পেয়েছিলেন কৌতুক অভিনয়ের জন্য এবং ৬ বার শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা বিভাগে।
বলিউডে এমনও একটি সময় ছিল, যখন কোনো চলচ্চিত্রে মেহমুদ থাকলে অনেক বড় নায়কও সেই ছবিতে অভিনয় করতে দ্বিধা করতেন—কারণ তাঁর অসাধারণ উপস্থিতি অনেক সময় নায়ককেও ছাপিয়ে যেত। এটি ছিল তাঁর অভিনয়ক্ষমতার সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি।
ব্যক্তিজীবনে তিনি কিংবদন্তি অভিনেত্রী মীনা কুমারীর ছোট বোন মধুকে বিয়ে করেন। তাঁদের সন্তানদের মধ্যে লাকি আলী (মকসুদ আলী) পরবর্তীকালে ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় গায়ক, গীতিকার ও সুরকার হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন।
জীবনের শেষদিকে হৃদরোগে ভুগছিলেন তিনি। চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যে অবস্থানকালে ২০০৪ সালের ২৩ জুলাই ঘুমের মধ্যেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর পর মুম্বাইয়ের মেহবুব স্টুডিওতে অসংখ্য ভক্ত, শিল্পী ও সহকর্মী তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানান।
আজ তাঁর মৃত্যুদিবসে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি সেই কিংবদন্তিকে, যিনি প্রমাণ করেছিলেন—হাস্যরসও এক মহৎ শিল্প। তাঁর অভিনয়, মানবিকতা এবং নতুন শিল্পীদের এগিয়ে দেওয়ার মানসিকতা ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি, মেহমুদ।
আপনার হাসি, অভিনয় ও অবদান প্রজন্মের পর প্রজন্ম দর্শকের হৃদয়ে অমলিন হয়ে থাকবে।