একসময় ঢাকাই চলচ্চিত্রের প্রাণকেন্দ্র ছিল বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি)। নতুন সিনেমার ঘোষণা, গল্পের আলোচনা, প্রযোজকের সঙ্গে পরিচালকের বৈঠক, শিল্পীদের আড্ডা, শুটিং, ডাবিং, এডিটিং—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই প্রতিষ্ঠান। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ফ্লোরজুড়ে থাকত ভীষণ ব্যস্ততা। এক ফ্লোরে গানের দৃশ্য, অন্য ফ্লোরে অ্যাকশন, কোথাও আদালতের সেট, কোথাও গ্রামের বাড়ি, কোথাও রাজপ্রাসাদ। ঝর্ণা স্পট, সুইমিং পুল কিংবা কড়ইতলা ছিল অসংখ্য জনপ্রিয় সিনেমার পরিচিত লোকেশন।
চিরচেনা সেই চিত্রপট এখন অনেকটাই বদলে গেছে। বিএফডিসি এখনো দেশের চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় সরকারি অবকাঠামো হলেও সিনেমার মূল কর্মকাণ্ড ধীরে ধীরে বাইরে সরে যাচ্ছে। রাজধানীর নিকেতন, গুলশান ও বনানীর বিভিন্ন প্রোডাকশন হাউজ, স্টুডিও এবং ব্যক্তিগত অফিস এখন নতুন প্রজন্মের নির্মাতাদের প্রধান কর্মক্ষেত্র। চলচ্চিত্রের পরিকল্পনা, স্ক্রিপ্ট ডেভেলপমেন্ট, কাস্টিং, সম্পাদনা, প্রচার—সবকিছুই এখন বেশি হচ্ছে এসব এলাকায়। ফলে প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্র কী তার গুরুত্ব হারাতে বসেছে?
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসের শুরুটা ছিল সংগ্রামের। ১৯৫৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত প্রথম বাংলা সবাক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ দেশীয় চলচ্চিত্র নির্মাণের সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলে দেয়। এর পরের বছর প্রতিষ্ঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা, যা স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন বা বিএফডিসি নামে পরিচিতি পায়। এরপর কয়েক দশক ধরে এই প্রতিষ্ঠান শুধু একটি স্টুডিও নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র শিল্পের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। এখান থেকেই তৈরি হয়েছে অসংখ্য কালজয়ী চলচ্চিত্র, তারকা, নির্মাতা।
আশি ও নব্বই দশকে বিএফডিসির ব্যস্ততা ছিল চোখেপড়ার মতো। শুটিং ফ্লোর পেতে অনেক সময় আগেই বুকিং দিতে হতো। পরিচালক, প্রযোজক, শিল্পী-কুশলী থেকে শুরু করে লাইটম্যান, মেকআপ আর্টিস্ট, সেট শ্রমিক—হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান ছিল এই প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে। ক্যান্টিনে বসেই জন্ম নিত নতুন সিনেমার গল্প, তৈরি হতো নতুন পরিকল্পনা, ঠিক হতো পরবর্তী প্রজন্মের তারকারা।
কিন্তু নব্বই দশকের শেষ দিকে বাংলা চলচ্চিত্রে অশ্লীলতার আগ্রাসন দর্শকের আস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা দেয়। পরিবার নিয়ে সিনেমা হলে যাওয়ার সংস্কৃতি ভেঙে পড়ে। একই সময়ে বিশ্ব যখন দ্রুত ডিজিটাল প্রযুক্তিতে এগিয়ে যায়, তখন বাংলাদেশের মূলধারার চলচ্চিত্র দীর্ঘদিন পুরোনো প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল ছিল। পরে স্যাটেলাইট টেলিভিশন, ইন্টারনেট এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্ম দর্শকের সামনে বিশ্বমানের কনটেন্ট সহজলভ্য করে দেয়। দর্শকের রুচি বদলে যায়, আর সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারেনি দেশের সিনেমা শিল্প। একের পর এক সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যায়। একসময় দেশে এক হাজারের বেশি প্রেক্ষাগৃহ থাকলেও এখন নিয়মিত চালু রয়েছে হাতে গোনা কিছু সিনেমা হল।
বিএফডিসি অবশ্য প্রযুক্তিগতভাবে অনেক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। আধুনিক ডিজিটাল ক্যামেরা, উন্নত এডিটিং প্যানেল, কালার গ্রেডিং স্যুট, ডাবিং ও রি-রেকর্ডিং সুবিধা, আধুনিক লাইটিং সরঞ্জাম, জিমি জিব, ট্রলি এবং বিভিন্ন ডিজিটাল পোস্ট-প্রোডাকশন সুবিধা যুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ অবকাঠামোগত সক্ষমতা আগের তুলনায় অনেক উন্নত। কিন্তু প্রযুক্তি থাকলেও সেই অবকাঠামোকে ঘিরে চলচ্চিত্র নির্মাণের ধারাবাহিকতা তৈরি হয়নি। বছরের বড় সময় অনেক ফ্লোর খালি পড়ে থাকে। কোথাও টেলিভিশন অনুষ্ঠান, কোথাও বিজ্ঞাপন কিংবা অন্য প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চললেও পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্রের শুটিং তুলনামূলকভাবে কমে গেছে।
অন্যদিকে, দেশের নতুন প্রজন্মের সফল চলচ্চিত্র নির্মাতারা ভিন্ন এক কর্মসংস্কৃতি গড়ে তুলেছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আলোচিত ও ব্যবসাসফল বেশির ভাগ সিনেমার পরিকল্পনা, প্রি-প্রোডাকশন, পোস্ট-প্রোডাকশন কিংবা নির্মাতাদের নিয়মিত কার্যক্রম বিএফডিসিকেন্দ্রিক নয়। নিকেতনের বিভিন্ন অফিস, স্টুডিও এবং প্রোডাকশন হাউজ এখন নতুন চলচ্চিত্র আন্দোলনের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। এখানেই স্ক্রিপ্ট নিয়ে আলোচনা হয়, বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠক হয়, ডিজিটাল প্রচারের পরিকল্পনা তৈরি হয় এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব নিয়েও কাজ হয়।
এর পেছনে রয়েছে সময়ের পরিবর্তন। আধুনিক চলচ্চিত্র এখন স্টুডিওনির্ভর না হয়ে লোকেশননির্ভর। বেসরকারি খাতে উন্নত ক্যামেরা, লাইট, সাউন্ড এবং পোস্ট-প্রোডাকশন সুবিধা সহজলভ্য হয়েছে। নতুন প্রজন্মের নির্মাতারা ছোট, দ্রুত এবং করপোরেট পরিবেশে কাজ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। প্রশাসনিক জটিলতা এবং দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগও অনেককে বিএফডিসির বাইরে কাজ করতে উৎসাহিত করেছে।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে চলচ্চিত্রের নেপথ্যের মানুষদের জীবনে। লাইটম্যান, মেকআপ আর্টিস্ট, সেট শ্রমিক, শুটিং বয়, টি-বয়, স্টান্টম্যান, এক্সট্রা শিল্পীসহ অসংখ্য মানুষ নিয়মিত কাজ হারিয়েছেন। আগে যেখানে মাসজুড়ে শুটিং চলত, এখন অনেকেই সপ্তাহের পর সপ্তাহ কাজ পান না। কেউ পেশা বদলেছেন, কেউ অন্য খাতে চলে গেছেন, আবার কেউ প্রতিদিন বিএফডিসিতে এসে কাজের আশায় অপেক্ষা করেন। চলচ্চিত্রের আলো নিভে যাওয়ার সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন এই মানুষগুলোই।
বিএফডিসি শুধু একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান নয়, এটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং পরিচয়ের অংশ। তাই এটিকে কেবল একটি ভাড়াভিত্তিক স্টুডিও হিসেবে রেখে দিলে চলবে না। আধুনিক চলচ্চিত্র প্রযুক্তি, ওটিটি কনটেন্ট, আন্তর্জাতিক কো-প্রোডাকশন, ভার্চুয়াল প্রোডাকশন, প্রশিক্ষণ এবং গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে বিএফডিসিকে নতুনভাবে গড়ে তোলার উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা, সহজ সেবা এবং সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়নও জরুরি।
নিকেতন হয়তো আজকের চলচ্চিত্রের নতুন কর্মচাঞ্চল্যের কেন্দ্র। কিন্তু বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের শিকড় এখনো বিএফডিসিতেই প্রোথিত। সেই শিকড়ে নতুন প্রাণ ফিরিয়ে আনতে না পারলে কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়, দেশের চলচ্চিত্র শিল্পও তার ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় হারাবে।