জীবনের প্রথম ছবিতে সুযোগ। চরিত্র—একজন ডাক্তার। বুকভরা স্বপ্ন আর দুরুদুরু বুকে এক রোগা-পাতলা যুবক প্রথম পা রাখলেন স্টুডিও ফ্লোরে। পরিচালক দৃশ্য বুঝিয়ে দিলেন। আলো জ্বলে উঠল। সামনে সেই সময়ের জনপ্রিয় অভিনেত্রী প্রভা দেবী।
শুটিং শুরুর আগেই ভিড়ের মধ্য থেকে কেউ বিদ্রূপ করে বলে উঠল— “এ কলির ভীমকে কোথা থেকে আনলেন? পায়ে শেকল বেঁধে রাখুন, নইলে ঝড় উঠলে উড়ে যাবে!”
অপমানের এখানেই শেষ নয়। ক্যামেরা চালু হওয়ার আগে প্রভা দেবী মজা করে তাঁর হাত ধরে বলেছিলেন— “আরে, এই ছেলে আমার ডাক্তারি পরীক্ষা করবে কী? ওর নিজেরই তো হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেছে!”
চারদিকে হাসির রোল ওঠে। পরিচালক সেদিন আর দৃশ্যটি ধারণ করেননি। ছবিটির নাম ছিল ‘ওরে যাত্রী’। ছবিটি শেষ পর্যন্ত মুক্তি পায়নি। সেই নবাগত অভিনেতার নাম তখন অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়—যিনি পরবর্তীকালে হয়ে ওঠেন বাংলা চলচ্চিত্রের চিরঅম্লান মহানায়ক উত্তম কুমার।
জীবনের শুরুটা ছিল অবহেলা, অপমান আর ব্যর্থতায় ভরা। কিন্তু তিনি হার মানেননি। অদম্য অধ্যবসায়, কঠোর পরিশ্রম এবং অভিনয়ের প্রতি অসীম ভালোবাসাই তাঁকে বাংলা সিনেমার ইতিহাসে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ নায়কের আসনে বসিয়েছে।
আরেকটি স্মরণীয় ঘটনা ‘হারানো সুর’ ছবির শুটিংয়ের। পরিচালক অজয় করের প্রয়োজন ছিল দুটি ফুলের মালা। কিন্তু হাতে ছিল মাত্র একটি। আরেকটি মালা আনতে লোক পাঠানো হলো। তখনকার টালিগঞ্জে বাজার ছিল না; লেক মার্কেট থেকে মালা আনতে সময় লেগে যায়। শুটিং শেষ হওয়ার বহু বছর পরে অজয় কর আক্ষেপ করে বলেছিলেন—সেদিন দ্বিতীয় যে মালাটি দিয়ে দৃশ্যটি ধারণ করা হয়েছিল, সেটি আসলে কেওড়াতলা শ্মশান থেকে আনা হয়েছিল। শুটিং বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তিনি বিষয়টি কাউকে জানাননি, এমনকি উত্তম কুমারকেও নয়।
তারপর এল সেই হৃদয়বিদারক দিন—২৩ জুলাই ১৯৮০।
সকালে স্নান, পূজা সেরে শুটিংয়ে যাওয়ার জন্য গাড়িতে উঠতে গিয়ে তিনি দেখলেন, প্রায় ১৭ বছর ধরে ব্যবহার করা তাঁর প্রিয় টেপ রেকর্ডারটি চুরি হয়ে গেছে। এই ঘটনাটি তাঁকে গভীরভাবে ভেঙে দেয়। টেপ রেকর্ডারটি ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী; শুটিংয়ের আগে তিনি নিয়মিত সেটি শুনতেন। সারাদিন ছিলেন অন্যমনস্ক, ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়াও করেননি।
সেদিন ‘ওগো বধূ সুন্দরী’ ছবির শুটিং চলাকালীন
তাঁর শেষ সংলাপ ছিল—
“আমিও দেখে নেব, আমার নাম গগন সেন…”
এই সংলাপ বলার কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তবুও বন্ধু দেবেশ ঘোষের নিমন্ত্রণ রাখতে রাতে তাঁর বাড়িতে যান, আড্ডাও দেন হাসিমুখে। কিন্তু গভীর রাতে বাড়ি ফিরে ফের অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
পাঁচজন চিকিৎসকের আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও ২৪ জুলাই ১৯৮০, রাত ৮টা ৩২ মিনিটে বাংলা চলচ্চিত্রের আকাশ থেকে চিরতরে অস্ত যায় এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
মাত্র ৫৩ বছরের জীবনে তিনি অভিনয় করেছিলেন প্রায় ২০০-রও বেশি চলচ্চিত্রে। সুচিত্রা সেনের সঙ্গে তাঁর জুটি আজও বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কিংবদন্তি। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’, ‘হারানো সুর’, ‘সপ্তপদী’, ‘ঝিন্দের বন্দী’, ‘নায়ক’, ‘চৌরঙ্গী’, ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’—একের পর এক কালজয়ী চলচ্চিত্র তাঁকে অমর করে রেখেছে। তিনি শুধু একজন অভিনেতা নন; তিনি ছিলেন এক সাংস্কৃতিক যুগের নাম, বাঙালির আবেগের অন্য নাম।
আগামীকাল, ২৪ জুলাই মহানায়ক উত্তম কুমারের প্রয়াণ দিবস।
শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করি বাংলা চলচ্চিত্রের সর্বকালের সেরা এই মহান শিল্পীকে।
প্রণাম মহানায়ক। আপনি নেই, কিন্তু আপনার সৃষ্টি, আপনার অভিনয়, আপনার হাসি আর আপনার স্মৃতি—চিরকাল বেঁচে থাকবে কোটি কোটি বাঙালির হৃদয়ে।