তাকে সিনেমা জগতে বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলা হিসেবে গণ্য করা হয়।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র যে অভিনেতাদের জন্য গর্ব করতে পারে তাঁদের মধ্যে একজন কিংবদন্তি অভিনেতা প্রবীরমিত্র। প্রায় পাঁচ দশকের অভিনয় জীবন তাঁর। অসংখ্য চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন।
প্রবীরমিত্রের নামটি আসলেই চোখের সামনে অসংখ্য চরিত্রের ছবি ভাসে। তিনি কখনো বাবা, ভাই, ছেলে, বন্ধু, পুলিশ অফিসার, ধনী, গরিব, জমিদার, একতারা দোতারা হাতে শিল্পী, সন্তানহারা পাগল কিংবা হক মওলার মতো চরিত্রও করেছেন। বহুমুখী চরিত্রের অসাধারণ একজন অভিনেতা। মঞ্চ যার ব্যাকগ্রাউন্ড তাঁর তো এমনই হবার কথা। অনেক চরিত্রে নিজের আইডেনটিটি তৈরি করতেই স্বচ্ছন্দ ছিলেন।
অভিনেতা প্রবীর মিত্র ১৮ আগস্ট ১৯৪৪ সালে চাঁদপুর জেলার এক জমিদার বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা গোপেন্দ্র নাথ মিত্র এবং মাতা অমিয়বালা মিত্র। তবে বংশপরম্পরায় পুরনো ঢাকার স্থায়ী বাসিন্দা তিনি। পুরনো ঢাকায় শৈশব কাটে।
তিনি প্রথম জীবনে সেন্ট গ্রেগরি থেকে পোগজ স্কুলে পড়াশোনা করেন। বিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায় জীবনে প্রথমবারের মত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ডাকঘর নাটকে প্রহরী চরিত্রে অভিনয় করেন। এরপর তিনি জগন্নাথ কলেজ (বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন।
স্কুলে নাটক করতেন অনেক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'ডাকঘর' নাটকে প্রায় সব চরিত্রে প্রক্সি দিতে হয়েছিল তাঁকে এবং এখান থেকেই অভিনয়ের নেশা পাকাপোক্তভাবে পেয়ে বসে তাঁকে। ক্লাস টু-তে তাঁর বন্ধু ছিলেন আরেক কিংবদন্তি অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামান। বিউটি বোডিং-এ যেতেন আর বিখ্যাত সব মানুষদের সাথে দেখা হত।
চলচ্চিত্রে প্রথম অভিনয় ১৯৬৮-তে পরিচালক এইচ আকবরের 'জলছবি' ছবিতে। ডাক্তারের চরিত্রে অভিনয় করতে হয়েছিল একজন শিল্পীর অনুপস্থিতিতে। এটিএম শামসুজ্জামানের স্ক্রিপ্টে 'জীবনতৃষ্ণা' ছবিতে 'এ আঁধার কখনো যাবে না মুছে' গানটিতে তিনি তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করেন। এরপর তাঁর ক্যারিয়ার এগিয়ে যেতে থাকে। বেশকিছু ছবিতে নায়ক এবং প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন।
তাঁর চরিত্রাভিনেতা হিসেবে উল্লেখযোগ্য কিছু ছবি আছে। 'রঙিন নবাব সিরাজউদ্দৌলা' ছবিতে তিনি আনোয়ার হোসেনের নবাব চরিত্রটি করেছিলেন। প্রবীরমিত্রের কণ্ঠেও 'বাংলা বিহার উড়িষ্যার মহান অধিপতি, তোমার শেষ উপদেশ আমি ভুলিনি জনাব' সংলাপগুলো বলিষ্ঠ ছিল এবং অভিনয়ও অনবদ্য ছিল। 'তিতাস একটি নদীর নাম' ছবিতে তাঁর তেজোদ্দীপ্ত লুক ছিল। কবরীকে কোলে করে নিয়ে যাওয়ার যে শটটি আছে ঐ দৃশ্যে তাঁকে অনবদ্য লাগে দেখতে। 'নয়নের আলো' ছবিতে জাফর ইকবালের বন্ধুর চরিত্রটি ছিল অসাধারণ। 'আমার বাবার মুখে প্রথম যেদিন' গানটিতে জাফরের পাশাপাশি প্রবীরমিত্রের অভিনয়ও উল্লেখ করার মতো। 'বড় ভালো লোক ছিল' ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে ছিলেন। এ ছবিতে 'হায়রে মানুষ রঙিন ফানুশ' গানটিতে প্রবীরমিত্রের অভিনয়ই সবচেয়ে ফোকাসে ছিল। এই ছবিতেই তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান ১৯৮২ সালে।
প্রবীর মিত্র তার প্রেমিকা সেলিনা হোসেন অজন্তাকে বিয়ে করেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন যে, বিয়ে করার সময় তিনি হিন্দুধর্ম থেকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হন। তখন তার নাম রাখা হয় হাসান ইমাম। অজন্তা ২০০০ সালে মৃত্যুবরণ করেন। এই দম্পতির তিন ছেলে ও এক মেয়ে, তারা হলেন - মিঠুন মিত্র, ফেরদৌস পারভীন, সিফাত ইসলাম ও সামিউল ইসলাম। ছোট ছেলে সামিউল ২০১২ সালে ৭ মে মৃত্যুবরণ করেন।
তিনি একজন ক্রীড়াবিদও ছিলেন। ঢাকা ফার্স্ট ডিভিশনের ক্রিকেটার ছিলেন, ক্যাপ্টেনও ছিলেন। ফার্স্ট ডিভিশনে হকি এবং সেকেন্ড ডিভিশনে ফুটবলও খেলেছেন।
প্র
বীর মিত্রকে বেশ কিছু শারীরিক জটিলতার কারণে ২০২৪ সালের ২২ ডিসেম্বর রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং ২০২৫ সালের ৫ জানুয়ারি তিনি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ৬ জানুয়ারি বিকেল ৩টা ৩০ মিনিটে আজিমপুর কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়।
প্রবীরমিত্র বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে অবধারিত একটি নাম। তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্র এবং দীর্ঘ ক্যারিয়ারের সাধনা অনেকের জন্য আদর্শ হয়ে থাকবে বিশেষ করে যারা চরিত্রাভিনেতা হতে চায়।
বরেণ্য এই অভিনেতার প্রতি জানাই শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা, জন্মদিনে তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি।