শাহিন ফকির,
পিরোজপুর জেলা প্রতিনিধি:
খালের জলে সারি সারি নৌকা। হালকা ঢেউয়ে দুলছে ছোট-বড় বাহারি সব তরী। খালের পাড়ের সড়কজুড়েও কেবল নৌকারই সমারোহ। দূর থেকে দেখলে মনে হয়—জল আর স্থলের সীমান্ত ঘেঁষে যেন জমে উঠেছে এক বিশাল ‘নৌকার রাজ্য’।
পিরোজপুরের নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠি) উপজেলার আটঘর কুড়িয়ানা ইউনিয়নের কুড়িয়ানা খালে প্রতি সোম ও শুক্রবার বসে শত বছরের পুরোনো এই ঐতিহ্যবাহী নৌকার হাট। প্রতি বর্ষায় দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির এক অনন্য মিলনমেলায় পরিণত হয় কুড়িয়ানা খালের আশপাশ।
হাটে ঘুরতে আসা এক পর্যটক বলেন, "দক্ষিণ বাংলার স্বরূপকাঠির আটঘর কুড়িয়ানা এক ঐতিহ্যবাহী ভাসমান নৌকার হাট। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এই হাটটি প্রায় ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে একই নিয়মে চলে আসছে এবং কারিগররা আজও তা টিকিয়ে রেখেছেন। দেশের বিভিন্ন জেলা ও স্থান থেকে মানুষ এখানে আসেন, কারণ সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্মত নৌকা পাওয়া যায়। পেয়ারা বাগান থেকে পেয়ারা সংগ্রহ, গবাদিপশুর ঘাস কাটা, ভাসমান সবজি চাষ এবং জলবেষ্টিত অঞ্চলের পারিবারিক চলাচলের জন্য মানুষ এখান থেকে নৌকা কিনে থাকেন।"
এক বিক্রেতা জানান, "আমি ছোটবেলা থেকেই এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। আমার বাবাও করতেন, আমি ২৫-৩০ বছর ধরে করছি। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তো বটেই, এমনকি আমাদের তৈরি নৌকা চায়না, জাপান, জার্মানি ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশেও অর্ডারের মাধ্যমে সরবরাহ করা হচ্ছে।"
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও প্রবীণদের মতে, প্রায় এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে কুড়িয়ানা খালে নিয়মিত বসে আসছে এই ভাসমান হাট। বর্ষা মৌসুমে পিরোজপুর ছাড়াও আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ আসেন পছন্দের নৌকা কিনতে।
হাটে আকার ও কাঠের মানভেদে প্রতিটি নৌকা ২ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। প্রতি হাটে গড়ে ২০০ থেকে ২৫০টি নৌকা বিক্রি হয়, যা থেকে দৈনিক আয় হয় প্রায় ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা। ব্যবসায়ীদের মতে, পুরো বর্ষা মৌসুমে এই হাটে প্রায় ১০ থেকে ১২ কোটি টাকার নৌকা কেনাবেচা হয়ে থাকে।
কেবল নৌকা কেনাবেচাতেই এখন আর সীমাবদ্ধ নেই এই হাট। বর্ষা মৌসুমে স্বরূপকাঠির বিখ্যাত ভাসমান পেয়ারা বাগান ও ঐতিহ্যবাহী এই নৌকার হাট দেখতে দেশের দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন অগণিত পর্যটক।
তবে হাটে আসা দর্শনার্থী ও ক্রেতা-বিক্রেতাদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই। নিরাপদ ওয়াশরুম, পাকা ঘাট, বিশ্রামাগার এবং গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা না থাকায় পর্যটকদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এসব নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, পর্যটক ও ব্যবসায়ীরা।
হাটের সার্বিক নিরাপত্তা ও রাজস্ব বিষয়ে ইজারাদার হুমায়ুন মোল্লা জানান, হাটে সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় রাখতে তারা কাজ করছেন। তবে বর্ষায় পর্যটকদের বাড়তি ভিড় সামলাতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন জরুরি।
পর্যটন সম্ভাবনা ও পর্যটকদের সুবিধার বিষয়ে নেছারাবাদ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বলেন, “পর্যটকদের স্বাচ্ছন্দ্য ও সুবিধার কথা বিবেচনা করে জেলা পর্যটন উন্নয়ন কমিটি ইতোমধ্যে কিছু পরিকল্পনা ও উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে।”
শুধু কেনাবেচার স্থান নয়—কুড়িয়ানা খালের এই ভাসমান বাজার এখন উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকার পাশাপাশি এক সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্র। বর্ষায় খালের জলে দুলতে থাকা সারি সারি নৌকা যেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা এক জীবন্ত ইতিহাসেরই কথা বলে।