সিসিটিভি/প্রত্যক্ষদর্শীর তথ্য ও পুলিশের তদন্তেই মিলবে ঘটনার প্রকৃত রহস্য | ছাত্রদল কর্মী আতিকুরকে ঘিরে রাজনৈতিক আলোচনা
কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরে বিয়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বরযাত্রীবাহী মাইক্রোবাসের গতিরোধ করে নববধূকে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছিল। ঘটনাটি প্রথমে ‘নববধূ অপহরণ’ হিসেবে ছড়িয়ে পড়লেও এখন সেই ঘটনায় এসেছে নতুন মোড়। নববধূ তামান্না আক্তার দাবি করেছেন, তাঁকে কেউ অপহরণ করেনি; তিনি নিজের ইচ্ছায় দীর্ঘদিনের প্রেমিক আতিকুর রহমান মিয়ার সঙ্গে চলে গেছেন।
রোববার (৩০ আগস্ট) বিকেলে উপজেলার জিনারী ইউনিয়নের হাজিপুর বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হোসেনপুর উপজেলার সিদলা ইউনিয়নের নয়াপাড়া এলাকার আবুল মিয়ার মেয়ে তামান্না আক্তারের সঙ্গে নান্দাইল উপজেলার রাজাবাড়িয়া গ্রামের আক্তার মিয়ার বিয়ে হয় ওইদিন। দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর নববধূকে নিয়ে মাইক্রোবাসে করে বরের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন বরযাত্রীরা।
পথে জিনারী ইউনিয়নের হাজিপুর বাজার এলাকায় পৌঁছালে একদল যুবক মাইক্রোবাসটির গতিরোধ করেন বলে স্থানীয়রা জানান। এ সময় গাড়িটি ঘিরে হইচই ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরে নববধূকে গাড়ি থেকে নামিয়ে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় মুহূর্তের মধ্যেই এলাকায় ‘নববধূ অপহরণ’-এর খবর ছড়িয়ে পড়ে।
নববধূর বক্তব্যে বদলে গেল ঘটনার চিত্র
ঘটনার পর তামান্না আক্তার দাবি করেন, তাঁকে জোর করে কোথাও নিয়ে যাওয়া হয়নি। তিনি নিজের ইচ্ছাতেই আতিকুর রহমান মিয়ার সঙ্গে চলে গেছেন।
তামান্নার ভাষ্য অনুযায়ী, আতিকুরের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তাঁরা একে অপরকে ভালোবাসতেন। কিন্তু পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁদের সম্পর্ক মেনে নেওয়া হয়নি। পরে পরিবারের সিদ্ধান্তে অন্যত্র তাঁর বিয়ে দেওয়া হয়।
এ অবস্থায় তাঁরা নিজেদের ইচ্ছায় একসঙ্গে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন বলে জানান তামান্না।
তাহলে গাড়ি থামানো হলো কেন?
নববধূর বক্তব্য সামনে আসার পর ঘটনার শুরু নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, বরযাত্রীর গাড়ি থামানো, একদল যুবকের উপস্থিতি, গাড়ি ঘিরে হইচই এবং পরে নববধূকে গাড়ি থেকে নামিয়ে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাই প্রথমে অপহরণের ধারণা তৈরি করেছিল।
কিন্তু তামান্না নিজেই যদি স্বেচ্ছায় যাওয়ার দাবি করেন, তাহলে হাজিপুর বাজারে ওই সময় আসলে কী ঘটেছিল—সে প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে।
স্থানীয় কয়েকজনের ভাষ্য, তামান্না ও আতিকুরের মধ্যে আগে থেকেই প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তবে ঘটনার সময় নববধূর ওপর কোনো ধরনের জোর প্রয়োগ করা হয়েছিল কি না কিংবা তিনি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় গিয়েছিলেন কি না, তা এখনো তদন্তের বিষয়।
আতিকুরকে ঘিরে রাজনৈতিক আলোচনা
ঘটনায় আলোচনায় আসা আতিকুর রহমান মিয়াদ জিনারী ইউনিয়নের চর হাজিপুর গ্রামের মজিবুরের ছেলে। দলীয় সূত্রে তিনি ছাত্রদলের কর্মী হিসেবে পরিচিত।
ঘটনার পর আতিকুরের ফেসবুক আইডিতে ‘জীবনে আর কিছু চাওয়ার নাই..!’ লেখা একটি পোস্ট নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়। এ নিয়ে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
হোসেনপুর উপজেলা ছাত্রদলের সদস্যসচিব দেলোয়ার হোসেন রাজীব আতিকুরকে ছাত্রদলের কর্মী হিসেবে নিশ্চিত করেছেন।
জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক রাফিউল ইসলাম নওসাদ জানিয়েছেন, ঘটনাটি জানার পর সাংগঠনিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পুলিশের বক্তব্য কী?
হোসেনপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ রাশেদুল ইসলাম বলেন, তামান্নার সঙ্গে আতিকুরের প্রেমের সম্পর্ক ছিল বলে পুলিশ প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছে। তাঁদের সম্পর্ক পরিবার মেনে নেয়নি।
ওসি বলেন, নববধূকে জোর করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল কি না, নাকি তিনি স্বেচ্ছায় আতিকুরের সঙ্গে চলে গেছেন—তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
তিনি আরও বলেন, পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেলে ঘটনার প্রকৃত তথ্য যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তদন্তেই মিলবে প্রকৃত উত্তর
একদিকে বরযাত্রীর গাড়ি থামিয়ে নববধূকে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা, অন্যদিকে নববধূর সরাসরি ‘অপহরণ নয়’ দাবি—দুই ধরনের তথ্য সামনে আসায় ঘটনাটি নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।
তামান্না ও আতিকুরের পূর্বের সম্পর্ক, বিয়েতে তামান্নার সম্মতি, হাজিপুর বাজারে গাড়ি থামানোর ঘটনা এবং নববধূকে গাড়ি থেকে নামিয়ে নেওয়ার সময় কোনো জোর প্রয়োগ হয়েছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এখন প্রশ্ন একটাই—হাজিপুর বাজারে সেদিন আসলে কী ঘটেছিল? সেই উত্তর পেতে পুলিশের তদন্ত ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যের দিকেই তাকিয়ে স্থানীয়রা।
বদরুজ্জামান ভূঁইয়া
হোসেনপুর কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি