শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬
 শিরোনাম
মধ্যপ্রাচ্যে ২৭টি মার্কিন ঘাঁটিতে আইআরজিসির হামলা সুনামগঞ্জ-এর ছাতক থানা পুলিশের অভিযানে নিয়মিত মামলার ৩ আসামি গ্রেফতার শাহ আমানত বিমানবন্দরে মধ্যপ্রাচ্যের ১০ ফ্লাইট বাতিল এনসিপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ, দেশজুড়ে কর্মসূচি বঙ্গোপসাগরে জলদস্যু দমনে প্রযুক্তিনির্ভর কঠোর নজরদারি-টহল প্রতিমন্ত্রী হয়ে নিজ এলাকায় নুরুল হক ইয়াবা ব্যবসায়ীদের এলাকা ছাড়ার হুঁশিয়ারি: টেকনাফে এমপি শাহজাহান চৌধুরী নগরবাসীর নিরাপত্তায় মধ্যরাতে রাস্তায় আইজিপি: আকস্মিক পরিদর্শনে কড়া বার্তা পাকিস্তান সীমান্তে আফগানিস্তানের হামলা, কাবুল-কান্দাহারে পাল্টা হামলা ফোন করে জামায়াত আমিরের স্বাস্থ্যের খোঁজ নিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

আজ লালনকন্যা ফরিদা পারভীন- এর মৃত্যুবার্ষিকী

আজ লালনকন্যা ফরিদা পারভীন- এর মৃত্যুবার্ষিকী

আজ লালনকন্যা ফরিদা পারভীন- এর মৃত্যুবার্ষিকী


বাংলা লোকসংগীতের আকাশে কিছু কণ্ঠ কখনো হারিয়ে যায় না। তাঁদের গান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে থাকে, মানুষের হৃদয়ে অনুরণিত হয়। ফরিদা পারভীন ছিলেন তেমনই এক অবিস্মরণীয় শিল্পী—যাঁর কণ্ঠে লালন সাঁইয়ের দর্শন, মানবতাবোধ ও অসাম্প্রদায়িকতার বাণী দেশ-দেশান্তরে পৌঁছে গিয়েছিল।

 

লালনগীতির প্রতি তাঁর অসামান্য সাধনা ও অবদানের কারণে তিনি মানুষের ভালোবাসায় পরিচিত হয়েছিলেন ‘লালনকন্যা’ ও ‘লালন সম্রাজ্ঞী’ নামে। তাঁর কণ্ঠে লালনের গান শুধু সংগীত হয়ে থাকেনি; হয়ে উঠেছিল আত্মজিজ্ঞাসা, মানবতার বাণী এবং জীবনদর্শনের এক অনন্য প্রকাশ।

 

শৈশব ও সংগীতে হাতেখড়ি
১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর নাটোরের সিংড়া থানার শাওল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ফরিদা পারভীন। বাবার চাকরির কারণে শৈশবের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গায় কাটলেও কুষ্টিয়ায় তাঁর বেড়ে ওঠা তাঁর পরবর্তী সংগীতজীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি ছিল তাঁর প্রবল আকর্ষণ।

 

মাগুরায় মাত্র চার-পাঁচ বছর বয়সে ওস্তাদ কমল চক্রবর্তীর কাছে তাঁর সংগীতে হাতেখড়ি হয়। পরবর্তীতে ওস্তাদ ইব্রাহিম খানসহ একাধিক গুণী শিল্পী ও ওস্তাদের কাছে তিনি শাস্ত্রীয় সংগীতে তালিম নেন। নজরুলসংগীতেও তিনি গভীর প্রশিক্ষণ লাভ করেন।


মাত্র ১৪ বছর বয়সে, ১৯৬৮ সালে, তিনি রাজশাহী বেতারের তালিকাভুক্ত নজরুলসংগীতশিল্পী হিসেবে পেশাদার সংগীতজীবন শুরু করেন।


নজরুলসংগীত থেকে লালনের ভুবনে
প্রথমদিকে তিনি নজরুলসংগীতশিল্পী হিসেবেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। কিন্তু কুষ্টিয়ার মাটিতে এসে তাঁর জীবনের সংগীতযাত্রা নতুন মোড় নেয়।


সাধক মকছেদ আলী শাহ-এর মাধ্যমে তিনি লালন সাঁইয়ের গানের গভীর দর্শনের সঙ্গে পরিচিত হন। পরবর্তীতে লালন আখড়ার সাধক-গুরুদের কাছ থেকেও তিনি লালনগীতির তালিম গ্রহণ করেন।
লালনের গানকে তিনি শুধু সুরে ধারণ করেননি—গানের বাণী, দর্শন, সুর ও অন্তর্নিহিত মানবতাবাদ অনুধাবন করে তা নিজের কণ্ঠে এক স্বতন্ত্র শিল্পরূপ দিয়েছেন। লালনের অসংখ্য গান সংগ্রহ ও সংরক্ষণেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
স্বাধীনতার পর লালনের গান গেয়ে তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। কুষ্টিয়ার দোলপূর্ণিমার আসরে তাঁর পরিবেশনা মানুষের মধ্যে বিশেষ সাড়া জাগায়। এরপর লালনগীতি যেন হয়ে ওঠে তাঁর জীবন ও সাধনার প্রধান পরিচয়।


যে গানগুলো আজও হৃদয়ে বাজে
ফরিদা পারভীনের কণ্ঠে লালনগীতির অসংখ্য পরিবেশনা আজও শ্রোতাদের মুগ্ধ করে। বিশেষভাবে স্মরণীয়—
খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়”
বাড়ির কাছে আরশিনগর”
“সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে”
“মিলন হবে কত দিনে”
“সময় গেলে সাধন হবে না”
এ ছাড়া তাঁর কণ্ঠে “এই পদ্মা এই মেঘনা”-র মতো দেশাত্মবোধক গানও বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে।


লালনের দর্শন ছড়িয়ে দিয়েছিলেন বিশ্বজুড়ে
ফরিদা পারভীন শুধু বাংলাদেশের শিল্পী ছিলেন না—তিনি ছিলেন বাংলা লোকসংগীত ও লালনগীতির আন্তর্জাতিক দূত।


জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সুইডেন, ডেনমার্কসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তিনি লালনগীতি পরিবেশন করেছেন। তাঁর শক্তিশালী কণ্ঠ ও স্বতন্ত্র পরিবেশনা আন্তর্জাতিক শ্রোতাদের কাছে বাউলগানকে নতুনভাবে পরিচিত করে তোলে।

 

জাপানের ফুকুওকা এশিয়ান কালচার প্রাইজ ২০০৮-এর Arts and Culture Prize লাভ তাঁর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। পুরস্কারটির সরকারি নথিতে তাঁকে বাউলগানের শিল্পমূল্য বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিকভাবে এর প্রচারে অসামান্য অবদান রাখা বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

পুরস্কার ও সম্মাননা
সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি লাভ করেন—
একুশে পদক — ১৯৮৭
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার — ১৯৯৩, শ্রেষ্ঠ নারী কণ্ঠশিল্পী
ফুকুওকা এশিয়ান কালচার প্রাইজ — ২০০৮, Arts and Culture Prize
১৯৯৩ সালে চলচ্চিত্রে তাঁর গাওয়া ‘নিন্দার কাঁটা’ গানটির জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ নারী কণ্ঠশিল্পীর স্বীকৃতি লাভ করেন।


শুধু শিল্পী নন, ছিলেন একজন সংস্কৃতিসাধক
ফরিদা পারভীনের কাজ শুধু মঞ্চে গান গাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। লালনগীতির শুদ্ধ সুর ও বাণী সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তিনি আজীবন কাজ করে গেছেন।
শিশু-কিশোরদের লালনগীতির সঠিক তালিম দেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘অচিন পাখি স্কুল’। পাশাপাশি জাপানি সরকারের সহায়তায় লালনগীতির সুর ও বাণী সংরক্ষণের জন্য ট্রাস্ট গঠনের উদ্যোগও নেন।


তাঁর স্বপ্ন ছিল লালন সাঁইয়ের দর্শন ও মানবতাবাদ নিয়ে আরও গভীরভাবে চর্চা করার একটি বিশেষ প্রতিষ্ঠান বা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা।

প্রয়াণ
দীর্ঘদিন কিডনি জটিলতায় ভোগার পর ২০২৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন উপমহাদেশের কিংবদন্তি এই শিল্পী। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭০ বছর।


তাঁর প্রয়াণে বাংলা সংগীতাঙ্গনে নেমে আসে গভীর শোক। কারণ ফরিদা পারভীন শুধু একজন শিল্পী ছিলেন না—তিনি ছিলেন একটি সংগীতধারা, একটি সাধনা এবং একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতিনিধি।

 

আজ তাঁর কণ্ঠ নেই, কিন্তু তাঁর গাওয়া গান আছে।
আছে—
“খাঁচার ভিতর অচিন পাখি…”
আছে লালনের মানবতার দর্শন।
আছে অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে তাঁর রেখে যাওয়া সুরের অনুরণন।
বাংলা লোকসংগীত ও লালনগীতির ইতিহাসে ফরিদা পারভীনের নাম তাই চিরকাল শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় উচ্চারিত হবে।


লালনকন্যা ফরিদা পারভীন—আপনি নেই, কিন্তু আপনার কণ্ঠের সাধনা ও সুর বেঁচে থাকবে অনন্তকাল। গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছি কিংবদন্তি শিল্পী ফরিদা পারভীনকে।
আল্লাহ তাঁকে পরম শান্তি দান করুন। আমিন।

 

বিনোদন প্রতিবেদক
মোহিত লাল সাহা