গায়ে গামছা জড়ানো। হাতে ১০ বছরের নাতনি রিথি আক্তারের ছবি। চোখেমুখে দুশ্চিন্তার ছাপ। অসুস্থ শরীর নিয়েও প্রতিদিন নাতনির খোঁজে ছুটে বেড়াচ্ছেন ৭১ বছর বয়সী নানা ইসমাইল শেখ। কখনো আত্মীয়স্বজনের বাড়ি, কখনো আশপাশের এলাকা—যেখানে নাতনির সন্ধান মিলতে পারে, সেখানেই ছুটছেন তিনি। এক মাস ধরে নিখোঁজ রিথিকে ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় দিন কাটছে পুরো পরিবারের।
গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বরমী ইউনিয়নের লাকচতল ভিটিপাড়া গ্রামের শিশু রিথি আক্তার। সে লাকচতল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। গত ২৯ আগস্ট বিকেল ৪টার দিকে কাউকে কিছু না বলে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকে তার আর সন্ধান পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় শ্রীপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে।
রিথি শাহাদাত হোসেন ও জোনাকি আক্তার দম্পতির মেয়ে। তার বড় বোন স্মৃতি আক্তারের বয়স ১৩ বছর। প্রায় নয় বছর আগে বাবা-মায়ের ছাড়াছাড়ির পর মা জোনাকি আক্তার অন্যত্র বিয়ে করে স্বামীর বাড়িতে চলে যান। এরপর থেকে দুই বোন নানা ইসমাইল শেখ ও নানি নুরজাহান বেগমের কাছেই থাকত।
পরিবারের সদস্যরা জানান, নিখোঁজ হওয়ার দিন দুপুরে হাঁসের বাচ্চা খুঁজে না পাওয়ায় রিথির নানি তার সঙ্গে কিছুটা রাগ করে কথা বলেন। পরে রিথি পাশের বাড়ির সমবয়সী এক শিশুর কাছে নিজের অভিমানের কথা জানায়। বিকেল ৪টার দিকে কাউকে কিছু না বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। সন্ধ্যা হলেও ফিরে না আসায় স্বজনেরা প্রথমে আশপাশের বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেন। পরে আত্মীয়স্বজনের বাড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ করেও তার সন্ধান না পেয়ে থানায় জিডি করা হয়।
মঙ্গলবার দুপুরে রিথিদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির বাইরে চেয়ারে বসে আছেন নানা ইসমাইল শেখ। অসুস্থ শরীর নিয়েও নাতনির ছবি হাতে নিয়ে বসে আছেন তিনি। নাতনির কথা বলতে গিয়ে বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
ইসমাইল শেখ বলেন, “এমন কোনো দিন নাই যে আমি তারে খুঁজতে বাইর হইছি না। আজকা আমি অসুস্থ, তাই যাইতে পারতেছি না। কালকা ময়মনসিংহ রেলস্টেশনে খুঁজতে যাইয়াম।”
কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। বলেন, “যে যার কাছে যাইতে কইছে, তার কাছেই গেছি। কবিরাজের পর কবিরাজ ধরছি। কিন্তু কেউ নির্দিষ্ট কোনো জায়গার কথা কইতে পারে নাই।”
ঘর থেকে রিথির একটি ছবি এনে তা দেখিয়ে ইসমাইল শেখ বলেন, “এই যে, এইডা রিথি। আমার রিথিরে যদি কোনো জায়গায় পান, তারে আমার বুকের মাইদ্দে ফিরায়া দিবাইন।”
বাড়ির উঠানে টানানো রিথির পোশাক দেখিয়ে তিনি বলেন, “এইযে রিথির কাপড়। এইগুলা পইরা রইছে। কিছুই নিয়া যায় নাই। ঘুমের মধ্যে মনে হয় রিথি আমারে ভাই কইয়া ডাকতাছে। খুব কষ্ট হয়।”
রিথির নানি নুরজাহান বেগম স্ট্রোকের পর অসুস্থ। শারীরিক অক্ষমতার কারণে তিনি নিজে বাইরে গিয়ে নাতনিকে খুঁজতে পারেন না। ঘর থেকে রিথির স্কুলব্যাগ এনে বইগুলো দেখাতে দেখাতে তিনি বলেন, “রিথি আমার আর তার নানার লগো গোমাইতো। সন্তানের মতো গু-মুত ফালায়া ডাংগর করছি মা ছাড়া। খালি মনে হয়, অক্কন যদি আয়া পরতো, তে তো ভালা অইতো।”
নুরজাহান বলেন, “রিথি আমার সব কাজ কইরা দিত। আমারে গোসল হরাইয়া দিতো। রান্না করলে জাল দিয়া দিতো। এখন খালি পরান পোড়ে।”
রিথির মামাতো বোন আফরিন আক্তার বলেন, ছোটবেলা থেকেই তারা রিথিকে নিজেদের সন্তানের মতো করে বড় করেছেন। তিনি বলেন, “এক মাস ধরে রিথি নিখোঁজ। রাতে ঘুমিয়ে থাকলে মনে হয়, সে আমাকে ডাকছে। আগে সারাক্ষণ সে আমাকে ডাকত, খোঁজত। এখন আর কেউ ডাকে না। তাকে খুব মিস করছি। পড়াশোনার কাজেও আমি তাকে সহযোগিতা করতাম। আমরা সবাই রিথির জন্য অপেক্ষা করছি।”
তিনি আরও বলেন, “আমার দাদা রিথির ছবি হাতে নিয়ে প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে খোঁজেন। আমরা যে যেখানে পারছি খুঁজছি। দাদার কষ্ট অনেক। তিনি কান্নাকাটি করেন, ঘুমের মধ্যে রিথির নাম ধরে ডাকেন। রিথিকে খুঁজে পেতে সবার সহযোগিতা চাই।”
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রিথি শান্ত স্বভাবের শিশু। বিদ্যালয়েও সে মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচিত ছিল। তার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শাহীনুর আলম বলেন, “সাধারণ ডায়েরির আলোকে পুলিশ কাজ করছে। একই সঙ্গে সামাজিক ও পারিবারিকভাবেও শিশুটির খোঁজ করা দরকার।”
রিথির পরিবারের সদস্যরা জানান, কোথাও তার সন্ধান পাওয়া গেলে শ্রীপুর থানায় অথবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করার অনুরোধ করা হয়েছে।
শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি
