নদী ও সাগরবেষ্টিত দ্বীপজেলা ভোলার একটি বড় অংশের মানুষ জেলে পেশার সঙ্গে যুক্ত। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী মৎস্যজীবী রয়েছেন, যারা প্রতিদিন নদীতে নেমে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। তাদের শ্রম, ঘাম ও জীবনঝুঁকি থাকলেও নেই কোনো সরকারি স্বীকৃতি বা পরিচয়। ফলে জেলেদের জন্য বরাদ্দকৃত ভিজিএফ চাল, বিশেষ খাদ্য সহায়তা বা অন্যান্য সরকারি সুবিধা থেকেও তারা বঞ্চিত হচ্ছেন।
পুরুষতান্ত্রিক প্রথা ও জেলে তালিকার অসংগতির কারণে বছরের পর বছর ধরে অবহেলিতই থেকে যাচ্ছেন তারা বলে অভিযোগ করেছেন নারী মৎস্যজীবীরা।
তেমনই একজন নারী জেলে কুলসুম বেগম। বয়স ৬০ পেরিয়েছে। স্বামীর সঙ্গে নদীতে নৌকায় বসবাস করে মাছ ধরে সংসার চালান তিনি। কিন্তু এত বছর পেরিয়ে গেলেও সরকারি কোনো সহায়তা পাননি। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, আর কত বয়স হলে জেলে কার্ড পামু? এই বয়সে নদীতে না গিয়া একটু ঘরে থাকতে চাই। রোদে পুড়ি, বৃষ্টিতে ভিজি। সরকার যদি আমাদের একটু খোঁজখবর নিত, তাহলে ভালো হইত।
ভোলা সদর উপজেলার রাজাপুর জোরখাল এলাকার বাসিন্দা রাশিদা বেগম (৫৫) বলেন, আমাগো জন্মই নৌকার মধ্যে। ছোটবেলা থেইকা নৌকায় থাইকা মাছ ধরি, সংসার চালাই। কিন্তু সরকার আমাদের কোনো জেলে কার্ড দেয় না। ঘর দেয়, কলোনি দেয়—আমরা কিছুই পাই না। নদীতে নদীতে থাকতে থাকতে বুড়া হইয়া গেছি।
আরেক নারী জেলে রোজিনা বলেন, আমরা নদীতে পোলাপান লইয়া অনেক কষ্ট করি। পুরুষের চেয়েও অনেক সময় বেশি পরিশ্রম করতে হয়। মাছ বিক্রি কইরা যা পাই, তা দিয়ে ঠিকমতো সংসার চালানোই কঠিন। যদি জেলে কার্ড বা ফ্যামিলি কার্ড পাইতাম, তাহলে কিছুটা সহায়তা হইত।
নারী জেলেদের দাবি, পুরুষদের পাশাপাশি তাদেরও জেলে হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সরকারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা এবং জেলে কার্ড প্রদান করতে হবে।
সংগ্রামী এসব নারীর জেলে হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন মৎস্যজীবী নেতারাও। ভোলা জেলা ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ এরশাদ উল্লাহ জানান, ভোলায় পুরুষ জেলেদের পাশাপাশি প্রায় দুই থেকে তিন হাজার নারী মৎস্যজীবী পেশার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। কিন্তু তারা এখনও সরকারি জেলে নিবন্ধনের আওতায় আসেননি। ফলে সরকারি সব ধরনের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।তিনি বলেন, পুরুষ জেলেদের পাশাপাশি নারী জেলেদেরও নিবন্ধনের আওতায় আনতে হবে। তারা সমানভাবে পরিশ্রম করে মাছ ধরেন। তাদের বাইরে রেখে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়।
এ বিষয়ে ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন বলেন, আগামী জেলে নিবন্ধনের সময় নারী জেলেদের অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে তাদের সংশ্লিষ্ট উপজেলা ও জেলার নাগরিক হতে হবে এবং স্থায়ী ঠিকানা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরো জানান, চলতি বছর জেলেদের জন্য বিশেষ খাদ্য সহায়তার আওতায় প্রায় ৪০০ পরিবারকে সহযোগিতা দেওয়া হবে।
ভোলা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান বলেন, সরকার যখন নতুন করে জেলে তালিকা প্রণয়ন করবে, তখন মানতা সম্প্রদায়ের নারী জেলেদেরও নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি তাদের সরকারি সব ধরনের সহায়তা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।
৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রেক্ষাপটে স্থানীয়রা মনে করছেন, জীবিকার ঝুঁকি নিয়ে নদীতে মাছ ধরা এসব নারী জেলেদের অধিকার ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। বর্তমানে ভোলা জেলায় প্রায় দুই হাজারের মতো নারী সদস্য সরাসরি মাছ ধরার পেশার সঙ্গে জড়িত বলে জানা গেছে।
