বাংলা চলচ্চিত্রে এমন কিছু অভিনেতা আছেন, যাঁরা নায়ক হয়েও আলাদা— আবার চরিত্রাভিনেতা হয়েও অনিবার্য। সমিত ভাঞ্জ ছিলেন ঠিক তেমনই একজন অভিনেতা। স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয়, স্বাভাবিক উপস্থিতি আর দুরন্ত ব্যক্তিত্বে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাঙালির ‘আপনজন’।
সমিত ভাঞ্জের জন্ম ১৯৪৪ সালের ২ জানুয়ারি, মেদিনীপুর জেলার তমলুকে। যদিও ভাঞ্জ পরিবারের আদি নিবাস ঘাটালের চন্দ্রকোনায়, ওকালতির সূত্রে তাঁর দাদু এসে বসবাস শুরু করেন তমলুকে। প্রীতিময় ও শীলাদেবীর সংসারে তিন ছেলে ও এক মেয়ে—সমিত ছিলেন ছেলেদের মধ্যে কনিষ্ঠ। পরিবারে গান–বাজনার চর্চা ছিল, যা তাঁর শিল্পমন গঠনে বড় ভূমিকা রাখে।
ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন দুরন্ত ও সাহসী। তাঁর শৈশবের নানা কাহিনি আজও কিংবদন্তির মতো—খেলতে গিয়ে মাথা ফেটে গেলে মাটি ঘষে আবার খেলায় ফিরে যাওয়া, কিংবা ছোটবোন কৃষ্ণাকে চড় মারায় রাগে সহপাঠীকে বালিতে পুঁতে দেওয়া—এই সব ঘটনাই তাঁর অদম্য ও ডাকাবুকো স্বভাবের পরিচয় দেয়।
এই দুর্দমনীয় আত্মবিশ্বাসই তাঁকে অভিনয়ের জগতে সাহসী করে তোলে। তপন সিংহ-এর মতো কিংবদন্তি পরিচালকের কাছ থেকে কার্যত জোর করেই সুযোগ আদায় করে নেন তিনি। তপন সিংহ তাঁর অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে সুযোগ দেন ‘আপনজন’ ছবিতে। এরপর আর তাঁকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
একটির পর একটি গুরুত্বপূর্ণ ছবিতে কাজ করেন সমিত ভাঞ্জ। অভিনয় করেছেন—
- সত্যজিৎ রায় (অরণ্যের দিনরাত্রি),
- তরুণ মজুমদার (ফুলেশ্বরী, দাদার কীর্তি, গণদেবতা),
- বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত (ফেরা),
- মৃণাল সেন, তপন সিংহ-সহ বহু দিকপাল পরিচালকের সঙ্গে।
উত্তম কুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, অনিল চট্টোপাধ্যায়, স্বরূপ দত্তদের পাশে দাঁড়িয়ে সমিত ভাঞ্জ নিজের আলাদা পরিচয় ও খ্যাতি তৈরি করেন।
শুধু বাংলা নয়—হিন্দি চলচ্চিত্রেও তাঁর উপস্থিতি স্মরণীয়। হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায় পরিচালিত বিখ্যাত ছবি ‘গুড্ডি’-তে নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করে সর্বভারতীয় দর্শকের নজর কাড়েন তিনি।
পরিচালক গৌতম ঘোষ ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। গৌতম ঘোষের ছবিতে অভিনয় করার ইচ্ছে ছিল শমিত ভাঞ্জের বহুদিনের। সেই সুযোগ আসে ‘আবার অরণ্যে’ ছবিতে। তখন তাঁর জীবনের শেষ সময় ঘনিয়ে এসেছে। চিকিৎসকের বারণ সত্ত্বেও সেই প্রস্তাবে তিনি আনন্দে বলে উঠেছিলেন— “ফ্যান্টাস্টিক!”
এই ছবিতে তাঁর অভিনয় আজও দর্শকের মনে গভীর ছাপ রেখে গেছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ছবিটি মুক্তি পাওয়ার আগেই তিনি চিরবিদায় নেন।
ব্যক্তিজীবনে শৈশবের প্রেমিকা রঞ্জা-কেই তিনি বিয়ে করেন। রঞ্জার পরিবার তখন তমলুকে ভাড়া থাকতেন, আর সমিত পড়তেন তমলুক কলেজে। দীর্ঘদিনের প্রেম পরিণয়ে রূপ নেয়, তাঁদের সংসারে জন্ম নেয় তিন কন্যা—রাখি, বিদিশা ও সহেলি।
২৪ জুলাই ২০০৩, মাত্র ৫৯ বছর বয়সে, কলকাতায় ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াইয়ে পরাজিত হয়ে তিনি চলে যান না-ফেরার দেশে।
আজ তাঁর প্রয়াণ দিবসে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করি এক অসাধারণ অভিনেতাকে যিনি পর্দায় ছিলেন প্রাণবন্ত,
আর জীবনে ছিলেন অকপট ও সাহসী।
শ্রদ্ধাঞ্জলি, সমিত ভাঞ্জ।