ভারতীয় সঙ্গীতাঙ্গনের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র সোনু নিগম শুধু একজন জনপ্রিয় প্লেব্যাক শিল্পী নন, তিনি আধুনিক ভারতীয় সংগীতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কণ্ঠশিল্পী হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। হিন্দি ও কন্নড় চলচ্চিত্রে অসংখ্য কালজয়ী গান গাওয়ার পাশাপাশি তিনি বাংলা, ওড়িয়া, তামিল, তেলুগু, মালয়ালাম, পাঞ্জাবি, মারাঠি, অসমীয়া, নেপালিসহ ২০টিরও বেশি ভাষায় গান গেয়ে কোটি কোটি শ্রোতার হৃদয় জয় করেছেন। অসাধারণ কণ্ঠের ব্যাপ্তি, আবেগময় উপস্থাপনা এবং ক্লাসিক্যাল সংগীতে দক্ষতার জন্য তাঁকে ভারতীয় প্লেব্যাক সংগীতের অন্যতম সেরা শিল্পী হিসেবে গণ্য করা হয়।
মাত্র চার বছর বয়সে তিনি তাঁর বাবা আগম কুমার নিগম-এর সঙ্গে মঞ্চে কিংবদন্তি গায়ক মোহাম্মদ রফি-র অমর গান "Kya Hua Tera Wada" পরিবেশন করে সবার নজর কেড়ে নেন। ছোটবেলা থেকেই বাবার সঙ্গে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান গাইতেন। পরে সংগীতকে পেশা হিসেবে গ্রহণের উদ্দেশ্যে ১৯ বছর বয়সে মুম্বইয়ে চলে যান এবং কিংবদন্তি শাস্ত্রীয় সংগীতগুরু উস্তাদ গোলাম মুস্তফা খান-এর কাছে তালিম গ্রহণ করেন।
ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে টি-সিরিজের কর্ণধার গুলশন কুমার তাঁকে "রফি কি ইয়াদে" অ্যালবামের মাধ্যমে পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দেন। ১৯৯৫ সালে জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠান 'সা রে গা মা'-এর সঞ্চালক হিসেবে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
একই বছরে 'বেওয়াফা সনম' চলচ্চিত্রের "আচ্ছা সিলা দিয়া" গানটি তাঁকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। তবে তাঁর ক্যারিয়ারের বড় মোড় আসে ১৯৯৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত 'বর্ডার' চলচ্চিত্রের দেশাত্মবোধক গান "সন্দেশে আতে হ্যায়"-এর মাধ্যমে। গানটি আজও ভারতীয় চলচ্চিত্র সংগীতের ইতিহাসে অন্যতম সেরা দেশাত্মবোধক গান হিসেবে বিবেচিত।
১৯৯৯ সালে প্রকাশিত তাঁর পপ অ্যালবাম 'দিওয়ানা' ভারতীয় নন-ফিল্ম সংগীতের ইতিহাসে অন্যতম ব্যবসাসফল ও জনপ্রিয় অ্যালবাম। "দিওয়ানা তেরা", *"আব মুঝে রাত দিন"*সহ একাধিক গান আজও শ্রোতাদের প্রিয়।
সোনু নিগম শুধু চলচ্চিত্রের গানেই সীমাবদ্ধ নন। তিনি ভক্তিমূলক, গজল, পপ, আধা-শাস্ত্রীয়, সুফি এবং স্বাধীন সংগীতেও সমান দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি গৌতম বুদ্ধ, ড. বি. আর. আম্বেডকর এবং মোহাম্মদ রফিকে উৎসর্গ করে একাধিক বিশেষ অ্যালবাম প্রকাশ করেছেন।
ভারত ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কুয়েত, বাংলাদেশ, নেপাল, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, মরিশাসসহ বিশ্বের বহু দেশে তিনি সফল কনসার্ট করেছেন। ২০০৭ সালে "Simply Sonu" নামে একক আন্তর্জাতিক সফরের মাধ্যমে বিদেশে একক কনসার্ট আয়োজনকারী প্রথম ভারতীয় শিল্পীদের অন্যতম হিসেবে নতুন ইতিহাস গড়েন।
গানের পাশাপাশি শিশুশিল্পী হিসেবে 'বেতাব', 'কামচোর', 'উস্তাদ' প্রভৃতি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। পরবর্তীতে 'জানি দুশমন: এক আনোখি কাহানি', 'কাশ আপ হামারে হোতে' এবং 'লাভ ইন নেপাল'-এর মতো ছবিতেও অভিনয় করেন। যদিও অভিনয়ে তিনি দীর্ঘদিন সক্রিয় ছিলেন না, তবুও তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়েছিল।
উল্লেখযোগ্য সম্মাননা-
- পদ্মশ্রী (২০২২)
- জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার – সেরা পুরুষ প্লেব্যাক গায়ক (২০০৪) – "কাল হো না হো"
- ফিল্মফেয়ার পুরস্কারসহ অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা।
সম্প্রতি সোনু নিগম Pinched Nerve (স্নায়ু চাপে ব্যথা) সমস্যায় ভুগছেন। এমআরআই ও সিটি স্ক্যানসহ চিকিৎসা চললেও তীব্র শারীরিক ব্যথার মধ্যেও তিনি কনসার্ট, রেকর্ডিং এবং সংগীতচর্চা অব্যাহত রেখেছেন। তাঁর এই নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্ব শিল্পীজীবনের এক অনন্য উদাহরণ।
তাঁর কণ্ঠে "কাল হো না হো", "অভি মুঝমে কাহিঁ", "সুরজ হুয়া মদ্ধম", "সাথিয়া", "ম্যায় আগর কাহুঁ", "দো পাল", "সন্দেশে আতে হ্যায়", *"দিওয়ানা তেরা"*সহ অসংখ্য গান প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শ্রোতাদের হৃদয়ে অমলিন হয়ে আছে।
ভারতীয় সংগীতকে বিশ্বমঞ্চে আরও সমৃদ্ধ করার জন্য সোনু নিগমের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা। তাঁর সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও সংগীতময় জীবনের জন্য আন্তরিক শুভকামনা।
শুভ জন্মদিন, সোনু নিগম।