বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের স্বর্ণালী অধ্যায়ের অন্যতম গুণী নির্মাতা কামাল আহমেদ। তিনি ছিলেন একাধারে চলচ্চিত্র পরিচালক, অভিনেতা এবং চিত্রনির্মাণের একজন দক্ষ কারিগর। পারিবারিক, সামাজিক ও মানবিক গল্পনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণে তিনি ছিলেন অনন্য। আশির ও নব্বইয়ের দশকের বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর অবদান আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।
১৯৩৫ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়া জেলায় জন্মগ্রহণ করেন কামাল আহমেদ। শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা থেকেই তাঁর অভিনয় ও চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহের সূচনা। পঞ্চাশের দশকে তিনি ঢাকার বিভিন্ন মঞ্চনাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে অভিনয়জীবন শুরু করেন এবং খুব অল্প সময়েই একজন দক্ষ মঞ্চশিল্পী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
চলচ্চিত্রে পদার্পণ-
ষাটের দশকে তিনি প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক এহতেশাম-এর পাশাপাশি আরও কয়েকজন খ্যাতিমান নির্মাতার সহকারী হিসেবে চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেন। এই সময়ের অভিজ্ঞতাই তাঁকে একজন পরিপূর্ণ চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে গড়ে তোলে।
১৯৬৬ সালে 'উজালা' চলচ্চিত্র পরিচালনার মাধ্যমে তাঁর একক পরিচালনা জীবনের সূচনা হয়। এরপর প্রায় তিন দশক ধরে তিনি একের পর এক জনপ্রিয় ও দর্শকনন্দিত চলচ্চিত্র নির্মাণ করে বাংলা চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করেছেন।
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার-
কামাল আহমেদের নির্মাণশৈলী, গল্প নির্বাচন এবং পরিচালনার মুন্সিয়ানার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি দুইবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ পরিচালক নির্বাচিত হন।
১৯৮৩ সালে — 'লালু ভুলু' চলচ্চিত্রের জন্য
১৯৯০ সালে — 'গরীবের বউ' চলচ্চিত্রের জন্য
এই দুটি চলচ্চিত্র তাঁকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে অন্যতম সফল পরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
অভিনেতা হিসেবেও সফল-
পরিচালনার পাশাপাশি তিনি একজন দক্ষ অভিনেতাও ছিলেন। তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে—
* ১৩ নং ফেকু ওস্তাগার লেন
* স্মৃতি টুকু থাক
* রাতের পর দিন
* শনিবারের চিঠি
* রংবাজ
এছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয় করে দর্শকদের প্রশংসা অর্জন করেন।
পরিচালিত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র-
▪️ উজালা
▪️ পরওয়ানা
▪️ রূপকুমারী
▪️ অবাঞ্ছিত
▪️ অধিকার
▪️ অশ্রু দিয়ে লেখা
▪️ অঙ্গার
▪️ অনির্বাণ
▪️ উপহার
▪️ অনুরাগ
▪️ ভাঙা গড়া
▪️ রজনীগন্ধা
▪️ লালু ভুলু
▪️ পুরস্কার
▪️ আওয়ারা
▪️ মা ও ছেলে
▪️ ব্যথার দান
▪️ গরীবের বউ
▪️ অবুঝ সন্তান
এছাড়াও আরও বহু জনপ্রিয় চলচ্চিত্র নির্মাণ করে তিনি বাংলা সিনেমাকে সমৃদ্ধ করেছেন।
কামাল আহমেদের নির্মিত চলচ্চিত্রে সমাজের বাস্তবতা, পারিবারিক মূল্যবোধ, ভালোবাসা, সংগ্রাম এবং মানবিক সম্পর্ক অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহীভাবে ফুটে উঠেছে। তাঁর চলচ্চিত্র শুধু বিনোদনই দেয়নি, বরং সমাজ ও জীবনের নানা দিক নিয়ে দর্শকদের ভাবতেও শিখিয়েছে।
১৯৯৮ সালের ৪ আগস্ট ঢাকায় এই বরেণ্য নির্মাতা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর (৬৪ বছরে পদার্পণ করেছিলেন)। কিন্তু তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্র এবং সৃজনশীল অবদান আজও বাংলা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের হৃদয়ে অম্লান।
মৃত্যুবার্ষিকীতে প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক কামাল আহমেদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র স্মরণ।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে তিনি চিরকাল একজন নিষ্ঠাবান, সৃজনশীল ও সফল নির্মাতা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।