আজ ২১ আগস্ট—বাংলা গানের জগতের অন্যতম বিশিষ্ট রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক কাদেরী কিবরিয়ার জন্মদিন।
জন্মদিনে তাঁকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা, অফুরন্ত ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা।
কাদেরী কিবরিয়া শুধু একজন গায়ক নন; তিনি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অংশ। তাঁর কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গান পেয়েছে এক স্বতন্ত্র মাধুর্য, সংযম ও আবেগের প্রকাশ। বিশেষ করে তাঁর নিজস্ব গায়কীভঙ্গি তাঁকে রবীন্দ্রসঙ্গীতের জগতে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় এনে দিয়েছে। The Daily Star-এর এক পুরোনো সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রতিবেদনে তাঁকে সত্তর ও আশির দশকের রেডিও-টেলিভিশন শ্রোতাদের কাছে অত্যন্ত পরিচিত শিল্পী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
শৈশব থেকেই সংগীতের পথে-
কাদেরী কিবরিয়ার জন্ম পাবনা জেলার ফরিদপুর উপজেলায়। শৈশব থেকেই সংগীতের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ জন্ম নেয়। সংগীতজীবনে তিনি বিশিষ্ট শিল্পী অজিত রায় ও দেবব্রত বিশ্বাসের কাছে তালিম গ্রহণ করেন।
তিনি ছিলেন জিঙ্গা শিল্পী গোষ্ঠীর সদস্য। ১৯৬৭ সালে তাঁর প্রথম টেলিভিশন উপস্থিতি ঘটে। এর দুই বছর পর, ১৯৬৯ সালে HMV থেকে তাঁর প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়, যাতে ছিল দুটি রবীন্দ্রসঙ্গীত।
সেই সময় থেকেই তাঁর কণ্ঠের স্বাতন্ত্র্য সংগীতপ্রেমীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে শুরু করে।
শিক্ষা ও রবীন্দ্রসঙ্গীত সাধনা-
সংগীতের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাতেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত মনোযোগী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাণিজ্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি তিনি শান্তিনিকেতনে গিয়ে রবীন্দ্রসংগীতের ওপর উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালে তিনি শান্তিনিকেতনে যান ঠাকুরের গানের ওপর উচ্চতর অধ্যয়নের জন্য। তাঁর এই সাধনা পরবর্তীকালে রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশনে আরও গভীরতা ও পরিমিতি এনে দেয়।
মুক্তিযুদ্ধের শব্দসৈনিক-
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেও কাদেরী কিবরিয়ার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গৌরবের।
তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত ও মুক্তিকামী মানুষের মনোবল জাগিয়ে তুলতে সাংস্কৃতিক যুদ্ধে অংশ নেন। মুক্তিযুদ্ধের অস্ত্র যেমন ছিল রণাঙ্গনের বন্দুক, তেমনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পীদের কণ্ঠও ছিল মুক্তির সংগ্রামের এক শক্তিশালী অস্ত্র।
সেই অর্থে কাদেরী কিবরিয়া শুধু একজন শিল্পী নন—তিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একজন গর্বিত অংশীদার।
🎼 রবীন্দ্রসঙ্গীতে স্বতন্ত্র অবস্থান-
আধুনিক ও দেশাত্মবোধক গানও তিনি গেয়েছেন। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় ও জনপ্রিয়তা রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী হিসেবে।
তাঁর কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গান যেন পেয়েছে এক মায়াময়, গভীর ও সংযত আবহ। পুরোনো দিনের গানকে নতুন প্রজন্মের শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তাঁর কণ্ঠে—
ছিন্ন পাতার সাজাই তরণী
পুরানো সেই দিনের কথা
এসো হে বৈশাখ
সহ অসংখ্য রবীন্দ্রসঙ্গীত আজও সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে বিশেষ আবেগ সৃষ্টি করে।
🎬 চলচ্চিত্রেও কণ্ঠ দিয়েছেন-
সংগীতের পাশাপাশি তিনি চলচ্চিত্রেও প্লেব্যাক করেছেন। ফলে তাঁর শিল্পীসত্তার বিস্তার ছিল রেডিও, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র এবং মঞ্চ—সব ক্ষেত্রেই।
একুশে পদকে সম্মানিত-
বাংলা সংগীত ও শিল্পকলায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার ২০১৩ সালে কাদেরী কিবরিয়াকে একুশে পদকে ভূষিত করে। সে বছর শিল্পকলায় অবদানের জন্য তিনি একুশে পদকের অন্যতম প্রাপক ছিলেন।
এই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি তাঁর দীর্ঘ সংগীতসাধনা ও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অবদানের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।
প্রবাসে থেকেও শিকড়ের টানে-
পরবর্তীকালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস শুরু করেন। নব্বইয়ের দশকে তাঁর যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাওয়ার কথা বিভিন্ন জীবনীমূলক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
তবে ভৌগোলিক দূরত্ব তাঁকে কখনোই বাংলা গান ও বাঙালির সাংস্কৃতিক শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। তাঁর কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গান আজও বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাঙালির হৃদয়ে বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও শেকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়।
জন্মদিনে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা
একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো পুরস্কার নয়—মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নেওয়া।
কাদেরী কিবরিয়া সেই বিরল শিল্পীদের একজন, যাঁর কণ্ঠের সঙ্গে মিশে আছে এক প্রজন্মের স্মৃতি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, রবীন্দ্রনাথের গান এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়।
আজ তাঁর জন্মদিনে জানাই—
গভীর শ্রদ্ধা
অফুরন্ত ভালোবাসা
শুভ জন্মদিন, কাদেরী কিবরিয়া।
আপনার কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গান আরও বহু প্রজন্মের হৃদয়ে বেঁচে থাকুক।
বাংলা সংগীতের আকাশে আপনার অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকুক।
“ছিন্ন পাতার সাজাই তরণী,
একা একা করি খেলা…”
শুভ জন্মদিন, প্রিয় শিল্পী।
সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন—গানের ভুবনে আরও দীর্ঘদিন আমাদের সমৃদ্ধ করুন।